Menu
Menu

গত ৪৫ বছর ‘৫ শব্দের বাক্যটি’ কাঁদিয়েছে শাহান আরা আবদুল্লাকে!

Share on facebook
Share on google
Share on twitter

জাকিরুল আহসান।।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ৫ শব্দের ছোট একটি বাক্য কাঁদিয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে মন্ত্রী আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর সহধর্মীনি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল কালরাতের প্রত্যক্ষদর্শী ও শহীদ জননী শাহান আরা বেগমকে। ভয়াল ওই রাতে বেঁচে গেলেও ৪৫ বছর পর্যন্ত একটি বাক্য ভুলতে পানেননি তিনি। ছোট সে বাক্যটি হলো ‘মা আমি তোমার কোলে উঠব’। গণমাধ্যমে যতবার ১৫ আগস্ট নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ততবার এ কথাটি বলতেই তার চোখ থেকে পানি ঝড়তে দেখা গেছে।

শাহান আরা বেগম সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, হঠাৎ আমাদের দরজা ভাঙ্গার শব্দ পেলাম। ঘাতকরা ভেতরে প্রবেশ করে। হ্যান্ডস আপ বলে আমাদের সবাইকে কর্ডন করে নিচ তলার ড্রইংরুমে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাখে। সিঁড়ির অর্ধেক নেমেই বাবু (সুকান্ত বাবু) বলে, ‘মা আমি তোমার কোলে উঠব’। আমি ওকে কোলে নিতে পারলাম না। নিচে নামার পর অস্ত্র ঠেকিয়ে ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ওপরে আর কে কে আছে? এমন সময় আমার শ্বশুর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন তার চোখের ইশারায় আমি বললাম, ওপরে আর কেউ নেই। যে কারণে ওপরের রুমগুলো তল্লাশি না হওয়ায় আমার স্বামীকে (আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ) খুঁজে পায়নি ঘাতকরা।

আমার শ্বশুর ঘাতকদের বলেছিল, তোমাদের কমান্ডিং অফিসার কে? কিন্তু উত্তরে ওরা বলে, আমাদের কোন কমান্ডিং অফিসার নেই। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ঘাতকরা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। আমরা মাটিতে পড়ে যাই। আমি শ্বশুরের পেছনে ছিলাম, আমার কোমরে গুলি লাগে। ব্রাশ ফায়ারে ছয়জন মারা যায়। আমরা গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কয়েকজন কাতরাচ্ছিলাম। এর মধ্যে আবার একদল লোক গাড়ি নিয়ে আসে। তখন ভাবলাম এই বুঝি শেষ। কিন্তু পরে দেখি রমনা থানার পুলিশ এসেছে।

পুলিশ আসার পর বাবুকে শহীদ ভাইয়ের বুকের নিচ থেকে উঠানো হলো। দেখলাম ওর নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিছু সময় আগে যে সন্তান আমার কোলে উঠতে চেয়েছিল, তাকে কোলে নিতে পারি নাই। সেই আদরের সন্তানের নিথর দেহ আমার চোখের সামনে। ‘মা আমি তোমার কোলে উঠব’ বাক্যটি বলেই কান্নাজুড়ে দেন হতভাগ্য মা শাহান আরা বেগম।

এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেছিলেন, আগস্ট মাস আসলেই বুকের ভেতরে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই দিনের ভয়াল চিত্র। সব শোক সইবার নয়। আজও বাবুর কথা মনে করে ডুকরে কাঁদি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল কাল রাতে ঘাতকের নির্মম বুলেটে শহীদদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত। আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি ও সাহান আরা বেগমের অতি আদরের বড় পুত্র সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত।

সূত্র মতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে মিন্টো রোডের ২৭ নম্বরে তাঁর (বঙ্গবন্ধু) বোন জামাতা ও তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতেও হামলা করে ঘাতকরা। যেখানে খুনীরা নির্মমভাবে হত্যা করে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ভাইয়ের ছেলে সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত এবং বরিশালের ক্রিডেন্স শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য আব্দুর নঈম খান রিন্টুকে। এছাড়াও ওই ঘটনায় আহত হন আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের সহধর্মিণী ও বঙ্গবন্ধুর বোন আমেনা বেগম, পুত্রবধূ বেগম সাহান আরা বেগম, কন্যা বিউটি সেরনিয়াবাত, হেনা সেরনিয়াবাত, পুত্র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত, ক্রিডেন্স শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য খ.ম জিল্লুর রহমান, ললিত দাস, রফিকুল ইসলাম ও সৈয়দ মাহমুদ।

সে দিনের বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শাহান আরা বেগম বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ফজরের সময় অতর্কিত হামলায় কেঁপে উঠে ঢাকার ২৭ নম্বরের মিন্টো রোডের বাড়ি। সেদিন ফজরের আযানের সময় গুলির প্রচন্ড শব্দে হঠাৎ আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। আমার শাশুড়ি (বঙ্গবন্ধুর বোন আমেনা বেগম) বলেন, বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, আমার ভাইকে (বঙ্গবন্ধু) ফোন দাও। তখন আমার শ্বশুর আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধুকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু কি কথা হয় তা আমরা জানি না।

শাহান আরা বেগমের ঘনিষ্ঠজন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দা মনিরুন নাহার মেরী জানান, সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাতের জন্ম একাত্তরের ২২ জুন। সে সময় আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেব মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। মা সাহান আরা বেগম শিশু সুকান্ত বাবুকে নিয়ে প্রাণের ভয়ে গ্রামকে গ্রাম পাড়ি দিয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সুকান্ত বাবুর পরিবারে খুশি নেমে আসে। এরই মধ্যে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হঠাৎ ঘাতকের আগমনে চার বছরের শিশুটি অনেকটাই ভয় পেয়ে আশ্রয় চায় মা সাহান আরা বেগমের কোলে। কিন্তু মমতাময়ী মা তার আদরের ছোট্ট শিশুপুত্রকে আর কোলে নিতে পারেননি। তার আগেই ঘাতকের তপ্ত বুলেটের আঘাতে মায়ের চোখের সামনেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সুকান্ত বাবুকে।

শহীদ জননী শাহান আরা বেগম (৭২) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রবিবার (৭ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহির…..রাজিউন)। স্বামী, ৩ পুত্র ও ১ কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, নাতী-নাতনী, গুণগ্রাহী রেখে গেছেন শাহান আরা। আজ সোমবার (৮ জুন) সকাল সাড়ে আটটায় মরহুমার লাশ নগরীর গোরস্থান সংলগ্ন মাদরাসা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে শহীদ জননী ও মুক্তিযোদ্ধা মরহুমা সাহানারা বেগমকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নগরীর মুসলিম গোরস্থানে দাফন করা হয়।

সর্বশেষ