Menu
Menu

বরগুনায় হৃদয় হত্যা: নেপথ্যে নির্দেশদাতা আওয়ামী লীগ সভাপতি রফিক কাজী

Share on facebook
Share on google
Share on twitter

গোলাম কিবরিয়া, বরগুনা।।
বরগুনায় ঈদের দিন বিকেলে শত শত স্থানীয় পর্যটকের সামনে কিশোর হৃদয়কে (১৫) হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নেপথ্যে মূল নির্দেশদাতা হিসেবে ঘুরে ফিরে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিক কাজির (৪৭) এর নামই আসছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেই রফিক কাজি তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন হৃদয়সহ হৃদয়ের বন্ধুদের ওপর হামলা চালাতে। আর এই নির্দেশ পেয়েই হৃদয়ের ওপর হামলা চালায় রফিক কাজির সন্ত্রাসী বাহিনী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় এলাকাবাসী এ তথ্য দিয়েছেন। এ ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শী এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের দিন বিকেলে সাত বন্ধু মিলে একসঙ্গে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের স্থানীয় পর্যটন কেন্দ্র গোলবুনিয়া ঘুরতে যায় হৃদয়। সেখানে পৌঁছার পর আকস্মিকভাবে হৃদয়ের সঙ্গে দেখা হয় তার পরিচিত এক মেয়ে বন্ধুর। এসময় তার সাথে কুশল বিনিময় করে হৃদয়। এরই মধ্যে হৃদয় এবং হৃদয়ের ওই মেয়ে বন্ধুকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে রফিক কাজির ছেলে ইউনুস কাজি (১৭)। ইউনুস কাজিও হৃদয়ের সাথে একত্রেই বরগুনার টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইন্সটিটিউট থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাজে মন্তব্য করায় ইউনুস কাজির সাথে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে ইউনুস কাজিকে একটি থাপ্পর মারে হৃদয়। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যায়।
তাৎক্ষণিকভাবে মিটমাট হলেও ইউনুস কাজি তার পিতা স্থানীয় ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিক কাজিকে গিয়ে হৃদয়ের বিষয়ে নালিশ করে। এরপর রফিক কাজি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেই তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে নির্দেশ দেন হৃদয়সহ হৃদয়ের বন্ধুদের ওপর হামলা চালাতে। এরপরই ইউনুস কাজি, নয়ন, হেলাল, নোমান, আবীর এবং তণীকসহ রফিক কাজির সন্ত্রাসীবাহিনী লাঠিসোটা নিয়ে হৃদয়ের ওপর হামলা চালায়। এসময় হৃদয় দৌড়ে বাঁচতে চাইলেও তাকে তাড়া করে পেটাতে থাকে ইউনুস কাজি, নয়ন, হেলাল, এবং নোমানসহ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল। একপর্যায়ে লাঠির প্রচণ্ড আঘাতে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে হৃদয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রফিক কাজির দস্যুতার এমন ইতিহাস অনেক পুরান। ২০০৪ সালে তুচ্ছ ঘটনায় আপন ভাই কনু কাজিকে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি করে নাড়ি-ভুড়ি বের করে দিয়েছিলেন রফিক কাজি নিজেই। ভাগ্যগুণে গুলি খেয়েও বেঁচে যান তার ভাই কনু কাজি। পরে এ ঘটনায় সালিশ মীমাংসার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে তা মিটমাট হয়ে যায়। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতার প্রভাব খাটিয়ে অন্যের রেকর্ডিও জমিতে মাছের বিশাল ঘের বানিয়েছেন রফিক কাজি। পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় শত শত গ্রাহকের কাছ থেকে তিনি টাকা তুলেছেন। ঘর প্রতি ২৫’শ থেকে ৩২’শ টাকা পর্যন্ত তিনি নিজের পকেটে ভরেছেন।।

চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিকো’ কোম্পানির বেড়িবাঁধ উন্নয়ন ও নদী তীর সংরক্ষণের জন্য ব্লক তৈরির কাজে প্রভাব খাটিয়ে শ্রমিক নেতা হয়ে সুকৌশলে সেখান থেকে তিনি লাখ টাকার মালিক হয়েছেন। গ্রামে জমিও কিনেছেন লাখ লাখ টাকার। অথচ বছর কয়েক আগেও দু’বেলা দু’মুঠো ভাত যোগাড় করতেও তার বেগ পেতে হত। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা রফিক কাজির ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না কেউই।

বিশেষ করে রফিক কাজির ভাগনে আহসান (৩৫), হাসান (৩২), আমীর হোসেন (২৫), ভাইয়ের ছেলে রাজা (৪০), নোমান (২২), জুয়েল (২০) এবং সোহাগসহ (২২) তার অনুসারী বনি আমিন (৩৫) এবং জাফর সিকদারদের (৪৫) ভয়ে রফিক কাজির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না কেউই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন এলাকাবাসী বলেন, গোলবুনিয়া নদীর পাড়ে প্রায় প্রতিদিনই শহর থেকে অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসেন। ঘুরতে আসেন অনেক তরুণ-তরুণীও। শহর থেকে তরুণ-তরুণীরা ঘুরতে এলে রফিক কাজিসহ তার ছেলে ইউনুস কাজি, ভাই কনু কাজির ছেলে নোমান, স্থানীয় আলতাফ মৃধার ছেলে হেলাল, লিটন হাওলাদারের ছেলে নয়নসহ আবীর এবং তনিক ও তাদের সহযোগীরা ছেলে মেয়েদের নানাভাবে হয়রানি করে। হৃদয় হত্যার ঘটনাটিও তেমনি একটি হয়রানির ফলাফলমাত্র।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেন বলেন, হৃদয়ের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তারা তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আশা করেন খুব দ্রুতই সকল অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে বরগুনা জেলা পুলিশ। তবে এ হত্যা মামলায় কতজন এবং কারা কারা আসামি হয়েছে সে বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে কিছু বলতে রাজি হননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেন।

সর্বশেষ