আগৈলঝাড়ায় সৌর সোলার সেচ পাম্পে কৃষকের মুখে হাসি

আগৈলঝাড়া প্রতিনিধি।।
সৌর সোলার সেচ পাম্পে সল্প মূল্যে জমিতে পানি দিতে পেরে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। এখানে ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের চেয়ে অর্ধেক মূল্যে জমিতে পানি দিতে পেরে কৃষকরা এখন অনেক খুশি।

বরিশালের কৃষি নির্ভর উপজেলা আগৈলঝাড়ায় কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের আওতায় একটি ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র আওতায় একটি সৌর সোলার চালিত সেচ পাম্প রয়েছে। সৌর সোলার চালিত সেচ পাম্পের আওতায় দুইটি ইরি-বোরো ব্লকে ৫০ একরের অধিক জমি সৌর সোলার সেচের আওতায় রয়েছে। এই দুইটি সৌর সোলার সেচ ইরি-বোরো ব্লকে প্রায় শতাধিক কৃষক রয়েছে।

সরেজমিন উপজেলা কৃষি অফিস, বিএডিসি ও কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থ বছরে উপজেলার যসার সোলার সেচ স্কিম এ ৩০ একর কৃষি জমিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এক কিউসেক সৌর শক্তি চালিত এলএলপি’র পাম্প পৃথক পৃথক টেন্ডারের মাধ্যমে, পাম্প হাউজ নির্মানে ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৪০৬ টাকা, পাইপ বসানো স্ট্রাকচার নির্মান ৫ লক্ষ ৮৪ হাজার ১২৭ টাকা, সোলারের মালামাল ২১ লক্ষ ২১ হাজার ৭৪২ টাকা, পাইপ ক্রয় ৪ লক্ষ টাকাসহ মোট ৩২ লক্ষ ৫৫ হাজার ২৭৫ টাকা ব্যায়ে প্রায় ১৬ হাজার ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প স্থাপন করে। বর্তমানে ওই ইরি-বোরো ব্লকে ৩০ একর জমিতে সাড়ে ৫ হাজারের উপরে ওয়াট সম্পন্ন সৌর সোলার সেচে পানি সরবরাহ করে আসছে। যসার সৌর সোলার পাম্পে অতিমাত্রার ক্ষমতা সম্পন্ন ৪২ টি সোলার প্যানেল রয়েছে।

এই ব্লকের ম্যানেজার হেমায়েত হোসেন জানান, আমরা সৌর সোলার সেচের মাধ্যমে চাষিদের জমিতে পানি দেয়া বাবদ প্রতি শতাংশে ২০ টাকা হারে নিচ্ছি। আমাদের পাশেই অন্য ইরি-বেরো ব্লকে বিদ্যুতের মাধ্যমে মটর দিয়ে ইরি-বোরো ব্লকে পানি দিয়ে শতাংশ প্রতি ৩৫ টাকা করে নিচ্ছে। অপর দিকে ডিজেল চালিত ইরি-বোরো ব্লকে শতাংশ প্রতি ৪০ টাকা করে নিচ্ছে। কাজেই আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি আমাদের এলাকায় কৃষকের কথা চিন্তা করে আরো বেশী সৌর সোলার সেচে ব্লক বৃদ্ধি করা হোক।

এই প্রকল্পের মূল উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে জানাগেছে সরকার দেশের সকল অনাবাদী জমি সেচের আওতায় আনা, ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো, বিদ্যুতের সাশ্রয়, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা ও পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির এই প্রকল্পটি (পাইলট) সরকার গ্রহন করে। সৌর সোলার প্যানেল স্থাপনে সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক মটর ও চার্জ কন্ট্রোলারসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ ইটালী ও জার্মান থেকে সংগ্রহ করা। এই ইরি-বোরো ব্লকে বিএডিসিকে মটরের ভাড়া বাবদ প্রতি বছর ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সৌর সোলার সেচ প্রকল্পটির জন্য চার শতাংশ জমি দিয়েছে পূর্ব রাংতা গ্রামের মৃত কাশেম বেপারীর মেয়ে সোনাবান বেগম। এই জমির ভাড়া বাবদ তাকে বছরে ৭০০ টাকা দেয়া হয়।

অপরদিকে উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের পশ্চিম কোদালধোয়া গ্রামে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের আওতায় সৌর শক্তি ও পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের (পাইলট) আওতায় সৌর সোলার চালিত ইরি-বোরো ব্লকে ২০ একর জমিতে পানি সরবরাহ করে আসছে। এখানে কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৩০ জন। ৫০০ মিটার বারিদ পাইপ, স্ট্রাকচার, সোলার প্যানেল, ১ টি পাম্প হাউজসহ পাম্প স্থাপনে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর পৃথক পৃথক টেন্ডারের মাধ্যমে সৌর সোলার সেচ পাম্প স্থাপনে ১৮ লক্ষ টাকা ব্যায় করে। ওই ব্লকের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য গনেশ পান্ডে জানান, আমাদের সৌর সোলার সেচে ইরি-বোরো ব্লকে প্রতি জন চাষি তার জমিতে ফলানো ধান থেকে পানির খরচ বাবদ ২০ ভাগের ১ ভাগ ধান ব্লক ম্যানেজারকে দেয়।
অন্যদিকে আমাদের পাশেই ডিজেল চালিত ইরি-বোরো ব্লকের ফলানো ধান থেকে ম্যানেজারকে পানির খরচ বাবদ ১০ ভাগের ১ ভাগ ধান দিতে হয়। কোদালধোয়া সৌর সোলার পাম্পে অতিমাত্রার ক্ষমতা সম্পন্ন ২৬ টি সোলার প্যানেল রয়েছে। সৌর সোলার চালিত সেচ প্রতিদিন সূর্য ওঠার সাথে সাথে চালু করে, আর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সেচ পাম্প চলে। এছাড়াও মেঘলা আবহাওয়া, কুয়াশা, ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগে সূর্যের মুখ দেখা না গেলে সৌর সোলার পাম্প বন্ধ থাকে।

সৌর সোলার পাম্প স্থাপনের পূর্বে কোদালধোয়া গ্রামের ইরি-বোরো ব্লকের আওতাধীন ২৫ জন কৃষককে নিয়ে গঠন করা হয়, “কৃষক মাঠ স্কুল”। ১২ সপ্তাহে ১২ টি সেশনে কৃষকদের প্রশিক্ষন দেয়া হয়। এ প্রশিক্ষনে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন বরিশাল জেলার কৃষি প্রকৌশলীরা। কোদালধোয়া গ্রামের কৃষক মিলন পান্ডে ও তার ভাই অমল পান্ডে সৌর সোলার সেচ পাম্প স্থাপনের জন্য ৪ শতাংশ জমি দিয়েছে।

এ বিষয়ে যসার সৌর সোলার সেচে চালিত ইরি-বোরো ব্লকের চাষী শহীদ ফকির বলেন, এই ব্লকে আমার ৪০ শতাংশ চাষযোগ্য জমি রয়েছে। কৃষকের উন্নতি মানে দেশের উন্নতি। আমাদের মতো চাষীর উন্নতি হলে দেশের উন্নতি হবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডিজেল চালিত ইরি-বোরো ব্লকের চেয়ে অর্ধেক মূল্যে জমিতে পানি দিতে পেরে আমরা খুশি।

এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী যসার সৌর সোলার সেচ ব্লকে দুই একর জমির মালিক নরেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত ইরি-বোরো ব্লকের চেয়ে অর্ধেক খরচ হয় সৌর সোলার সেচ প্রকল্পে। সরকার আমাদের এলাকায় আরো বেশী করে সৌর সোলার সেচ প্রকল্প চালু করলে আমরা কৃষকরা উপকৃত হবো।

বাকাল নওপাড়া ডিজেল চালিত ইরি-বোরো ব্লকের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের ব্লকে ৪০ টাকা হারে প্রতি শতাংশ জমিতে পানি দিচ্ছি। আমার এখানে ৬৭ শতাংশ জমি রয়েছে, যদি সৌর সোলার স্কীম পাম্পে পানি দিতে পারতাম তাহলে অর্ধেক টাকা কম খরচ হতো। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি এই ব্লকটি সৌর সোলার সেচ প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দোলন চন্দ্র রায় বলেন, আগৈলঝাড়ার কৃষকদের কথা ভেব্বে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ (এমপি) সৌর সোলার সেচ স্কীম প্রকল্পটি আগৈলঝাড়ায় আনেন। এভাবে আরো বেশী প্রকল্প চালু হলে অত্র এলাকার কৃষকেরা সল্প খরচে ইরি-বোরো চাষাবাদ করতে পারবে। এই পরিবেশ বান্ধব প্রকল্পে জমিতে দেয়ার জন্য ভূ-গর্ভস্থ থেকে উঠানো পানি ৩০-৫০% সাশ্রয়ী হয়।

এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলার দ্বায়িত্বে থাকা বিএডিসি’র (ক্ষুদ্র সেচ) উপ-সহকারী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ সিকদার বলেন, যসার সৌর সোলার স্কীম ইরি-বোরো ব্লকে সোলার প্যানেলে প্রতিদিন ১৫ হাজার ৩৩০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। ৫ হাজার ৫০০ ওয়াট সেচ পাম্পে খরচ হয়। এখানে কৃষকদের জন্য একটি হাস্কিন মেসিন দেয়া হয়েছে, যা দ্বারা ধান সিদ্ধ ও ভাঙানো যায়।

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের প্রকৌশলী (বরিশাল অঞ্চল) জিএম আবদুর রহমান বলেন, এটি সরকারের একটি পরিবেশ বান্ধব প্রোজেক্ট। পরিবেশ দূষন রোধ, বিদ্যুৎ সংকটের চাপ কমানো, পানির অপচয় রোধ, প্রতিদিন ৮-১০ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পানি সরবরাহ করে আসছে।

এ ব্যাপারে বরিশাল বিএডিসি’র সহকারী প্রকৌশলী মো. গোলাম রব্বানী বলেন, পরিবেশ বান্ধব সৌর শক্তি চালিত এই সেচ যন্ত্রের মাধ্যমে কৃষকেরা ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যাবহার করে ফসল উৎপাদন করে আসছে। এতে প্রতি একরে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়। অপরদিকে বৈদ্যুতিক মটর অথবা ডিজেল চালিত সেচযন্ত্র দ্বারা জমিতে পানি দিলে প্রতি একরে ৩-৪ হাজার টাকারও বেশী খরচ হয়, যা সৌর সোলারের চেয়ে ৩-৪ গুন বেশী।