করোনায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রনোদনা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম: বরখাস্ত ১

ভান্ডারিয়া প্রতিনিধি, বরিশাল।।
করোনাকালিন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দকৃত প্রনোদনায় বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। খামারি না হয়েও অনেকে প্রনোদনা তালিকায় নাম লেখিয়ে নিয়েছে টাকা। আবার প্রকৃত খামারিদের কারো কারো তালিকা নাম থাকলেও প্রনোদনার টাকা পাইনি। এমন একাধীক অনিয়মের অভিযোগে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের এক মাঠ কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ।

সদ্য বরখাস্তকৃত শিবলী রুবায়েত লিয়নের অনিয়মের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে অভিযোগ দিলে তিনি আবেদন কারীদের নানা ভাবে ভয়ভতি ও হয়রানী সহ হামলা করে আসছে। এসব ঘটনায় প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে অভিযোগ পত্র দাখিলের পর হামলার শিকার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আঃ আলিম হাওলাদার বাদি হয়ে সম্প্রতি শিবলী রুবায়েত লিয়ন সহ ৭ জনের বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে আঃ আলিম হাওলাদার ছেলে জানান, শিবলী রুবায়েত লিয়নকে শুধু চাকুরী থেকে অব্যাহতি দিলেই হবে না। সে সরকারি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে তা উদ্ধার করে সুফল ভোগীদের মাঝে বন্টনসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানান।

সুত্র জানায়, ২০২০ সালের ৩০আগষ্ট করোনা কালিন সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ণে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) জরুরী কর্মপরিকল্পনার আওতায় উপজেলার সুফলভোগী নির্বাচনের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য এক নির্দেশনা জারি করেন প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোঃ আব্দুর রহিম। তার স্বাক্ষরিত জারিকৃত নির্দেশনাপত্রে বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠী এবং পিরোজপুর জেলা এলাকা রয়েছে। জারিকৃত আদেশে বলা হয়, প্রকল্প এলাকার ৬১ জেলার ৪৬৬টি উপজেলা থেকে ডেনরী(২-৫)গাভী ,(৬ ৯) গাভী, (১০-২০)গাভী,সোনালী মুরগী (১০০-৫০০),(৫০১-১০০০), (১০০০+মুরগী) ব্রয়লার (৫০০-১০০০),(১০০১-২০০০),লেয়ার (২০০-৫০০) মুরগী, (৫০১-১০০০), (১০০০+মুরগী) হাঁস (১০০-৩০০), (৩০১-৫০০)এবং (৫০০+হাঁস) মোট ১৫টি ক্যাটাগরী ও সাব ক্যাটাগরী ৪ লাখ,৭ হাজার ৪০২ জন খামারির নাম সুপারিশ করেন।

লক্ষ্যমাত্রার অবশিষ্ট খামারিদের পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ধাপে বিবেচনা করা হবে বলেও উল্ল্যেখ রয়েছে। ওই পরিপত্রের আলোকে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় ১৫টি ক্যাটাগরীতে ৫১১ জনের তালিকা প্রস্তুত করার কথা থাকলেও ভান্ডারিয়া পৌরসভা সহ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন থেকে তালিকা প্রস্তুত করে উপজেলা প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের আট সদস্যের একটি টিম মাঠ পর্যায়ে ৫০৬ জন প্রকৃত খামারির নামের তালিকা করে। পরে ওই তালিকা যাচাই বাছাই করার জন্য ৫ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সদস্য সচিব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাগণ যাচাই বাছাই শেষে প্রকল্পের নিয়মানুযায়ী সুফলভোগীর নাম, ভোটার আইডি কার্ড,ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, বিকাশ নম্বর সহ ওই বছরের ১৩ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করে উপজেলা প্রানি সম্পদ অধিদপ্তর। পরে সুফল ভোগীদের স্ব-স্ব বিকাশ নম্বরে প্রকল্পের ১৫টি ক্যাটাগরী অনুযায়ী সহায়তা পেয়ে যান।

এদিকে অনেক প্রকৃত খামারিরা প্রনোদনার অর্থ না পাওয়ায় তখন আবেদন কারীরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে ৫০৬ জন সুফলভোগীর তালিকা দেখেন এবং ওই তালিকার মধ্যে সুবিধা বঞ্চিত ৮৫ জন হাঁস,মুরগীর খামার বা ডেইরী খামারির নাম নেই বলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের আবু হানিফ হাওলাদার। অভিযোগে উল্ল্যেখ করা হয় ওই অফিসের ফিল্ড এ্যাসিস্টান্ট শিবলী রুবায়েত লিয়ন নিজের প্রভাব খাটিয়ে নিজ বাড়ি এবং তার স্বজন সহ নিয়ন বর্হীভূত ১৫ জনের নাম তালিকা ভূক্ত করেন এবং তারা ওই প্রনোদনার সুবিধাও ভোগ করেন।

একাধীক খামারিরা জানান, শুনেছি অনেকে ১০ থেকে ৩০ হাজার প্রযর্ন্ত প্রনোদনা পেয়েছে। করোনা কালিন প্রনোদনা তালিকায় প্রকৃত খামারির পরিবর্তে প্রানিসম্পদ বিভাগের কিছু মাঠ কর্মীরা অর্থের কাছে ম্যানেজ হয়ে স্বজনদের, সরকারি চাকুরী জীবী, ক্ষমতাসীন দলের ও খামার বিহীন মানুষের নাম তালিকায় দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রকৃত খামারের ছবি তুলে ওই সব ভুয়া খামারি ব্যক্তিদের নামে চালিয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত খামারির নামের তালিকায় তাদের পছন্দের বিকাশ নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ কারনে করোনার প্রনোদনা থেকে কয়েক শত প্রকৃত খামারিরা বঞ্চিত হয়েছে।

স্থানীয় খামারি রিয়াজ হাওলাদার ও খোকন হাওলাদার জানান, আমরা গরু ও মুরগীর খামার করে এখন পথে বসেছি। এখন ঘরে চাল নেই। অভাব অনটনে মানবেতর জীবন যাপন করছি। শুনছি এ উপজেলায় সরকার করোনায় অনুদান হিসেবে প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে কিন্তু আমরা কিছু পাইনি।

অপর খামারি খলিলুর রহমান জানান, প্রনোদনা তালিকায় নাম দেয়ার জন্য আমি ছবি তুলে দিলে মাঠ কর্মীরা ২ হাজার টাকা চেয়ে ছিলো । আমি দিতে না পাড়ায় তারা আমার নাম তালিকায় দেয়নি।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার বিশ্বাস জানান, এ তালিকা প্রস্তুতের সময় তিনি ছিলেন না। তিনি এ উপজেলায় অল্প কয়েক মাস হয় জয়েন্ট করেছেন। তবে, এ ঘটনায় একটি অভিযোগ পেয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির রির্পোট ঘটনার আংশিক সত্যতা পাওয়া যায়। এবং চলতি বছরের ২৫মে ওই তদন্ত প্রতিবেদন ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উপজেলা ভ্যাটানারী সার্জন ডাঃ সোমা সরকার সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরন করেছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক সীমা রানী ধর জানান, যদিও আমি এখানে নতুন জয়েন্ট করেছি তবুও চলতি মাসের প্রথম দিকে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভার সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান মো.মিরাজুল ইসলাম বিষয়টি সভায় উত্থাপণ করলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইতো মধ্যে তদন্ত কমিটি বিষয়টির আংশিক সত্যতা নিশ্চিত করে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরন করা হয়েছে। ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী ঘটনায় সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থ্যা গ্রহন করা হয়েছে বলে শুনতে পেয়েছি।

এ বিষয়ে ওই সময়ে পিরোজপুর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দ্বায়িত্বে থাকা মো. আমজাদ হোসেন ভূইঞা এর নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, যদিও আমি এখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কর্মরত আছি। তবে ঐ বিষয়টি তৎসময়ে উপজেলা কার্যালয়ে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ আমাকে লিখিত ভাবে জানিয়েছে।

তিনি আরো জানান, উপজেলা কার্যালয় থেকে প্রেরিত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরে ঘটনায় জড়িত লাইভস্টক ফিল্ড এ্যাসিস্টান্ট শিবলী রুবায়েত লিয়নকে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ চাকুরী থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন।