করোনা ভাইরাসের নামও শুনেনি এসব অঞ্চলের মানুষেরা!

ফিচার ডেস্ক।।
বর্তমানে ভয়ানক এক মহামারির কবলে পৃথিবী। পুরো বিশ্বই আজ এর ভয়াল থাবায় লণ্ডভণ্ড। এ পর্যন্ত প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষকে সংক্রমিত করেছে প্রাণঘাতী এই ব্যাধি। প্রাণ নিয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের। পুরো বিশ্বই এর তাণ্ডবে দিশেহারা।

বিগত ছয় মাস যাবত করোনাভাইরাস বিশ্বকে বিধ্বস্ত করেছে, আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে থামিয়ে দিয়েছে এবং অর্থনীতিকে মন্দায় ফেলেছে। এগুলো তো মোটামুটি সবাই জানেন। তবে জানেন কি? এই পৃথিবীরই অনেক মানুষ, জাতি বা গোষ্ঠিরা এখনো জানে না করোনাভাইরাস সম্পর্কে। তারা জানেই না পুরো বিশ্ব যে এখন এক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে যে যার জায়গা থেকে।

অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়? ভাবছেন এরা আবার কারা, যারা এতো কিছু হয়ে গেল অথচ কিছুই জানে না। আজকের এই লেখায় জানাবো এমনই জাতির কথা যারা বিশ্ব মহামারির খবর কিছুই জানেন না। দিব্যি স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন তারা।

আফ্রিকায় অনেক ইথিওপীয় অভিবাসী রয়েছে যারা এখনো স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করছেন। তারা করোনাভাইরাস সম্পর্কে জানেই না। বিশ্বের অনুন্নত দেশ গুলোর মধ্যে আফ্রিকা অন্যতম। এখানে সারাক্ষনই দুর্ভিক্ষ লেগে থাকে। এখানকার উপজাতিরা বাস করে দারিদ্র্য সীমার অনেক নিচে। এই অঞ্চলে শিক্ষার অভাব রয়েছে। তাই বিশ্ব সম্পর্কে সাধারণ জনগনের তেমন কোনো ধারণাও নেই।

তারা এতটাই অশিক্ষিত আর দরিদ্র্য যে ঠিকভাবে তিনবেলা খাবারই জোগাড় করতে পারে না। সেখানে বর্হিবিশ্বের খোঁজ রাখা তাদের কাছে স্বপ্ন। মোগাদিসুতে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর প্রোগ্রাম অফিসার কার্লোত্তা পঞ্চেট্টির মতে, এখানকার মানুষেরা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। সেখানে তারা শরনার্থী হিসেবে যায়, পরবর্তীতে কাজ করে জীবন চালায়।

এখানকার নারী এবং শিশুরা বেশি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করছে। এতে করে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, আইওএম যখন অভিবাসীদের কাছে জানতে চেয়েছিল যে, তারা করোনভাইরাস সম্পর্কে জানে কি-না? সেখানকার মানুষের উত্তর শুনে আইওএম সদস্যরা তাজ্জব বনে যায়।

মার্চ মাসে যখন করোনভাইরাস প্রথম সোমালিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং মহামারী হিসাবে ঘোষিত হয়। আইওএমের জরিপ করা ৮৮ শতাংশ অভিবাসী করোনভাইরাস সম্পর্কে শুনেইনি তখনো পর্যন্ত। তবে জুনের শেষের দিকে এসে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে এখনো ৪৯ শতাংশ মানুষ এই ব্যাপারে জানেন না। তারা যখন এই ভাইরাসের ভয়াবহতা এবং এর থেকে বাঁচার জন্য সচেতন থাকাসহ নানা পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। যার মধ্যে ছিল অবিশ্বাস, অবাক, সংশয়, ভয় এবং অনিশ্চয়তা।

আইওএম-র দেয়া একটি ভিডিওতে শরনার্থী এক নারী বক্তব্য রাখেন। হালিমা ইব্রাহিম হাসান নামক ওই নারী বলেন, এই গোষ্ঠীটি মার্চের শেষের দিকে করোনভাইরাস সম্পর্কে তাকে জানায়। সামাজিক দূরত্ব এবং হাতের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তারা পরামর্শ দিয়েছে। তারা বুঝিয়েছে এই ভাইরাসটি কেবল অমুসলিমকেই প্রভাবিত করে না। এটি যে কোনো মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এই রোগটি শুধু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লুএইচও) সতর্ক করে জানিয়েছে, আফ্রিকাতে কোভিড-১৯ সংক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে। মহাদেশটিতে এখন পর্যন্ত সংক্রমণের সংখ্যা অর্ধ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। ১১ হাজারের বেশি মৃত্যুর রেকর্ড করেছে। ইথিওপিয়ায় ছয় হাজার আক্রান্ত এবং মারা গেছেন ১০০ জন। সোমালিয়ায় তিন হাজার আক্রান্ত এবং ৯০ জন মারা গেছেন।

আইওএম পূর্ব ও হর্ন অব আফ্রিকার মুখপাত্র যোভন এনডেগ যোগ বলেন, এখানকার অভিবাসীরা প্রায়শই কোনো মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পান না। তাই এই ভাইরাসের সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না তারা। আর ঘনবসতি এবং পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের অভাব থাকায় এই ভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

মিয়ানমার: আফ্রিকার এই অঞ্চল ছাড়াও মিয়ানমারের রাখাইন এবং চীন রাজ্যের নয়টি শহরের মানুষেরা করোনাভাইরাস সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। মানবতাবাদী কর্মীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লু) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উভয়কেই বলেছে, মিয়ানমারের বেশিরভাগ অংশে বিশ্বের দীর্ঘতম ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে করে নতুন করোনভাইরাসজনিত মারাত্মক রোগ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের পক্ষে জানা সম্ভব হচ্ছে না।

তারা বলেন, গ্রামে কতজন লোক ভাইরাস সম্পর্কে জানেন তা বলা অসম্ভব। তবে তিনি বলেছিলেন, কয়েক হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। এতে করে ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। একজন ত্রাণকর্মী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে বলেছিলেন, শিবিরগুলোতে কোভিড-১৯ সম্পর্কে সচেতন মাত্র কয়েক জন লোক রয়েছেন।

অনুমান অনুসারে, মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ এই ভাইরাসের ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছে। মিনব্যা শহরতলির একজন বাস্তুচ্যুত, যিনি ভাইরাস সম্পর্কে জানতেন এমন এক ব্যক্তি বলেন, যুদ্ধের সময় শত্রুদের থেকে বনে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা যায়। তবে ভাইরাস থেকে লুকানোর কোনো পথ নেই।

ব্রাজিল: ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পরে দ্বিতীয়। এখন পর্যন্ত দেশটিতে ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক। প্রায় ৬৬ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে সেখানে। সংক্রমিত আছেন ১২ হাজারের বেশি। দিনে গড়ে ৪০০ এর বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। তবুও সেখানকার অনেক উপজাতি এখনো এই ভাইরাসের খবরই জানেন না।

ব্রাজিলের আমাজনে বাস করে নানা উপজাতির মানুষ। তাদের নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা।ব্রাজিলের প্রায় ৩০০ আদিবাসী গণমাধ্যমের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। যে কারণে তারা করোনভাইরাস প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সচেতন হতে পেরেছিলেন। তবে বাকি ১০টি আদিবাসী গোষ্ঠী ছিল যাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানতে পারেনি। দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ সেখানে বিমান পাঠিয়েছিল, আদিবাসীদের সচেতনতা বাড়াতে।

যদিও এর আগে আমাজন নানা কারণে অনেকবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সেসব ছিল অন্য বিষয়। তবে এবারের ব্যাপার পুরোই ভিন্ন। শুধু করোনাভাইরাসই নয় মানুষ এখানে যে রোগই নিয়ে আসে তা-ই এদের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করে। স্বাস্থ্য কর্মীরা তাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আর পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শ দেন। সূত্র-এবিসিডটনেটনিউজ।