কলাপাড়ায় আমন নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকেরা

এইচএম হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)।।
আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ। দুই পাশে ফসলি জমি আর ঝোপঝাড়। এই পথ ধরে এগিয়ে যেতে চোখে পড়ছে কর্মব্যস্ততা। বেশির ভাগ জমিতে আমনের জন্য জমি চাষ ব্যস্ততা চলছে। জমিতে সেচ দেওয়া শেষে কোদাল হাতে বাড়ি ফিরছিলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নয়াকাটা গ্রামের কৃষক আবদুল আজিজ (৪৯)। সেচ মেশিন দিয়ে জমিতে পানি দেওয়া হচ্ছে। আমনের চারা রোপণ করতে খেতে চারা পরিচর্যা করছেন কৃষক। ডিজেলের দাম বাড়ায় এবার ধান উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই বীজ ও সার বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে কৃষককে।

‘এই বছর হামার খুব কষ্ট হইছে। আকাশত পানি নাই, তেলের দাম বাইরছে, কারেন্ট নাই। আবার সারের দামও বাড়িল। খরচ যেমন বাড়েছে, ধানের দাম কম, তাতে আবাদ করি কী হইবে, বুঝেছি না।’ বৃষ্টির অভাবে জমি চাষ ও ধানের চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষকেরা। অনেক কৃষকের আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে কয়েক দফা। এদিকে বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এবার বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে আমনের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এপ্রিলের শুরু থেকেই এ অঞ্চলে তাপমাত্রাও অপেক্ষাকৃত বেশি। বর্ষাকালেও পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হয়নি। উপজেলার কয়েকজন কৃষক বলেন, বর্ষা মৌসুমের আমন আবাদে সাধারণত সেচের কোনো প্রয়োজন হয় না। কিন্তু প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে এ বছর সেচযন্ত্র বসিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি সম্পসারণ বিভাগ জানায়, এ বছর ৩১ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষি, পরিবহন, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানিসহ সব খাতেই এর প্রভাবে হবে মারাত্মক। আর এর মূল ভুক্তভোগী হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। বিশেষ করে কৃষি খাত থমকে দাঁড়াবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্যমন্দার যে পূর্বাভাস রয়েছে, সেদিক বিবেচনা করে জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের মূল্য আগের মূল্যে নামিয়ে আনা দরকার। আর অন্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সহনীয় করে মূল্য পুনর্র্নিধারণ করা দরকার।

হঠাৎ ডিজেলের দাম বাড়ার খবরে আকাশ ভেঙে পড়েছে কৃষকের মাথায়। গত বছরের নভেম্বরে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়ে। এবার নতুন করে ডিজেলের মূল্য ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউরিয়া সারে ছয় টাকা ও টিএসপিতে কেজি প্রতি আট টাকা মূল্যবৃদ্ধির ধকল। পূর্বঘোষণা ছাড়াই সরকার ৫ আগস্ট মধ্যরাতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি করেছে। এখন একজন ক্রেতাকে প্রতি লিটার ডিজেল-কেরোসিন ১১৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর আগে গত বছরের ৪ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করেছিল সরকার। সরকার ডিজেলের দাম কম রেখে পেট্রল আর অকটেনের দাম বাড়ালে কৃষির ওপর কোনো প্রভাব পড়ত না। খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ত না। কারণ, পেট্রল আর অকটেন তো ধনীদের তেল।

চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই বীজ ও সার বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে কৃষককে। সরকারি হিসাবে, প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ১০০, ইউরিয়া ৮০০, ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) ৮০০ ও এমওপির (মিউরেট অব পটাশ) দাম ৭৫০ টাকা। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দরে এসব সার বিক্রি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ১ আগস্ট থেকে ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু কৃষকদের ইউরিয়াসহ অন্য সব সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে জানুয়ারিতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ছিল ৮ দশমিক ৯ মিলিমিটার, সেখানে বৃষ্টি হয়েছে ৪ দশমিক ৩। ফেব্রæয়ারিতে বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাত হয়। ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছিল ৩৬ দশমিক ৪। তবে মার্চে ৫৭ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টি হয়নি এক ফোঁটাও। এপ্রিলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ছিল ১৩৫ দশমিক ৫ মিলিমিটার, সেখানে মাত্র ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর মে মাসে ২৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, সেখানে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আবার জুনে ৪০৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে ৩১৪ মিলিমিটার এবং জুলাইতে ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টির কথা থাকলেও হয়েছে ১৯৪ মিলিমিটার। ফেব্রুয়ারি থেকে সদ্য সমাপ্ত জুলাই পর্যন্ত তাপমাত্রা ৩২-৩৬ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করেছে। এ ক্ষেত্রে অনুভূত তাপমাত্রা ৪৪-৪৬ ডিগ্রি।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি তাপপ্রবাহের ফলে বর্ষা মৌসুমে মৌসুমি বায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেও জমাট বাঁধতে পারছে না। এতে বর্ষা মৌসুমে কম বৃষ্টি ঝরেছে।

এবার জানুয়ারি থেকে তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টিহীনতা তাপমাত্রাকে আরও অসহনীয় ও ঊর্ধ্বগামী করে তুলছে। জুন-জুলাই মূল বর্ষাকাল হলেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। মূলত অধিক তাপমাত্রার কারণেই এটা হয়েছে। তবে আগস্টে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাতের আশা আছে। ফলে দিন-রাতের তাপমাত্রা খুব একটা পার্থক্য থাকে না। এর সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতারও হাত রয়েছে।

শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। বেজার মুখে আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমনে খেতত (খেতে) সেচ দেওয়া নাগে না। কিন্তু এইবার পানি কম হইচে। সেচ দিয়া চারা নাগাবার যায়ে খরচ বাড়ি গেইচে। সার, ওষুধের দামও বাড়িছে। তেলখান বাদ যাবে ক্যানে, সেখানেও বাড়িল। খরচ যেমন বাড়িছে, ধানের দাম কি তেমন পামো? মনে হচে না। দেশের জন্য কৃষক খাটি মরিলেও কেউ হামার দিকে দেখে না। বীজ, সার, ওষুধ, তেল, মজুরি সবকিছুর দাম খালি বাড়িছে আর বাড়িছে।’

বালীয়াতলী গ্রামের কৃষক আমিন গাজী, জালাল হাওলাদার ও জলিল শিকদার বলেন, তাঁদের এলাকায় পাওয়ার টিলার দিয়ে প্রতি একর জমি চাষ করতে আগে ২ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়ার পর এখন তা তিন হাজার টাকা লাগছে। ‘ডিজেলের দাম যে রহম সরকার বাড়াইছে, হ্যাতে মোগো বাঁচনের তো কোনো পত (পথ) দেহি না। ডিজেলের দাম বাড়ে, সারের দাম বাড়ে। কিন্তু বাজারে গ্যালে ধানের দাম নাই। বাজার সদাইয়ের গায় তো হাত দেওন যায় না। তাইলে কন, কৃষক বাঁচবে ক্যামনে?’। জ্বালানি তেলের দাম অসহনীয় পর্যায়ে বেড়েছে। সরকারি নির্ধারিত দামেও সার পাওয়া যাচ্ছে না। সার ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, সরকারিভাবে সারের দাম যা নির্ধারন করা হয়েছে ডিলাদের সেইভাবে বিক্রি করতে হবে। কোনো ডিলার যদি বেশি করে তা যদি লিখিত অভিযোগ পাওয়া তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।