‘কীসের দিবস! মোগো কোনো দিবস নাই, গতর খাটি-মজুরি পাই’

রূপালী ডেস্ক।।
বিধবা কহিনুর বেগম (৪০) ও স্বামী পরিত্যক্তা আসমা আক্তার (৩৫) থাকেন বরিশাল নগরীর পলাশপুর কলোনিতে। মঙ্গলবার (০৮ মার্চ) বেলা ১১টায় এই দুইজনসহ কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা হয় নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ময়লাখোলা-টেক্সটাইল সড়কের বটতলা এলাকায়।

ওই সড়কটির নির্মাণকাজ চলছে। ইট ভাঙা এবং ভাঙাইট মাথায় নিয়ে কাঁচা রাস্তায় ফেলছেন কহিনুর, আসমা, জায়েদা বেগম, লিলি আক্তার, সোনাবান বিবিসহ ৭-৮ জন নারী। তাদের সঙ্গে একই কাজ করছেন ১০-১৫ জন পুরুষ শ্রমিক।

সকাল ৮টায় ওই নারীরা কাজের সাইটে আসেন। বাসায় ফেরেন সন্ধ্যা ৬টায়। ১০ ঘণ্টা হারভাঙা পরিশ্রম করে ওই নারী শ্রমিকরা দৈনিক জনপ্রতি মজুরি পান ৪৫০ টাকা। আর একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা পান ৬০০ টাকা।

নারী শ্রমিকদের মজুরি কেন কম দেওয়া হয় জানতে চাইলে কহিনুর বেগম বলেন, ‘মোগো কম দেয় ক্যা, কমু ক্যামনে, কামতো কম করি না’। আসমা আক্তার বলেন, ‘মোগো লগে ব্যাডারা (পুরুষ) এইক কাম করে, হ্যাগো ৬০০ টাহা দেয়। মোগো যে ক্যান ৪৫০ টাহা দেয় বুঝি না। কাম না করলে খামু কী? হের লইগ্যা যা পাই হেইয়াই হাতে লই।’

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। তা জানেন কি না প্রশ্ন করা হলে নারী শ্রমিকদের নেতা জায়েদা বেগম বলেন, ‘কীসের দিবস? মোগো কোনো দিবস নাই। গতর খাটি, মজুরি পাই’।

ময়লাখোলা-টেক্সটাইল সড়কে কর্মরত পুরুষ শ্রমিক কাশিপুর গ্রামের সেলিম মাঝি (৫৫) ও রেজভী হাসান (৩৫) বলেন, ‘মাইয়া মানসে খাডনির কাম করতে পারে না। ওনাগো (নারী শ্রমিক) চাইতে মোরা কাম বেশি করি, মজুরিও বেশি পাই।’

সড়কটির নির্মাণকাজের ঠিকাদার বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল। ঠিকাদারের নিয়োজিত সাইট ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়ার বিষয়ে বলেন, আমরা প্রত্যেক শ্রমিককে মাথাপিছু ৬০০ টাকা করে দেই শ্রমিক সরদার দুলালের কাছে। দুলাল কাকে কত টাকা দৈনিক মজুরি দেন তা জানি না।

শ্রমিক সরদার দুলাল নির্মাণ সাইটে ছিলেন না। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, শ্রমঘণ্টা, মজুরিসহ সকল ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। সমাজে নারীরা এখনো অবহেলিত, সবচেয়ে বেশি শোষিত। নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া অমানবিক কাজ।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশালের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, নারীর প্রতি বৈষম্য, শোষণ, নির্যাতন, বঞ্চনা কমছে না, বরং বাড়ছে। এখনো নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়াই তার প্রমাণ।

বরিশাল ইমারত নির্মাণশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. আলম খান বলেন, নারী-পুরুষের সমান মজুরি হওয়া উচিত। নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া নিন্দনীয়। আমাদের সংগঠনে অভিযোগ করলে সমান মজুরি পাওয়ার উদ্যোগ নেব।