কুয়াকাটার আথিয়তায় মুগ্ধ ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকরা

কাজী সাঈদ, কুয়াকাটা প্রতিনিধি ॥
এ বছর ঈদের লম্বা ছুটিতে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের বেলাভূমি সাগরকন্যা কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছেন কমপক্ষে দুই লক্ষ পর্যটক ও দর্শনার্থী। আগত এসব পর্যটকরা কুয়াকাটার ব্যবসায়ীদের আথিয়তায় মুগ্ধ হয়েছেন। এবারই প্রথম পর্যটকদের নিকট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এমনকি হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেননি কেউ। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক মনিটরিং করায় এ পরিবর্তন বলছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। দেশের অন্যান্য পর্যটন এলাকার চেয়ে কুয়াকাটায় ভ্রমণে খরচ কম হচ্ছে এমনটাই জানাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা।

ট্যুরিস্ট বোড মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি জনি আলমগীর বলেন, আমরা কুয়াকাটায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা করি। পর্যটক আসলে আমাদের ব্যবসা চলে, না আসলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তাই আমরা সবসময় পর্যটকদের সেবা নিশ্চিত করে ব্যবসা করি। আমাদের বিরুদ্ধে কখনো পর্যটকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেনি, করতেও পারবে না। তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর হোটেল-মোটেল ও খাবার-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পর্যটকদের নিকট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ থাকলেও এ বছর এমন অভিযোগ কেউ করেন নি।

কুয়াকাটা সৈকত ঘুরে বিভিন্ন শ্রেনির পর্যটকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাগরকন্যা কুয়াকাটার আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল-রেস্টুরেন্ট, অটোভ্যান, মটোরসাইকেল, ওয়াটারবাইক ভাড়া অনেকটা সাশ্রয়ী। এখানে ভার্মিচ আচার, জুতা, গেঞ্জি, প্যান্টসহ সবকিছুর দাম নিয়ন্ত্রনে আছে। শুটিকী মাছের দামও ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আছে। দেশের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের সাথে তুলনা করে কয়েকজন পর্যটক বলেন, কুয়াকাটার প্রত্যেকটি জিনিসের দাম কক্সবাজারের চেয়ে কম। এখানকার ব্যবসায়ীরাও অতিথি আপ্যায়ন। প্রত্যেকটি খাবার হোটেলে মূল্য তালিকা টানানো আছে।

কুয়াকাটা খাবার হোটেল-রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কলিম মাহমুদ বলেন, আমাদের প্রত্যেকটি হোটেলে মূল্য তালিকা টানানো আছে। অতিরিক্ত দাম নেয়ার সুযোগ নেই। আমরা মানসম্মত খাবার সরবরাহ করছি। আমরা পর্যটকদের সেবা দিয়ে ব্যবসা করতে চাই।

ঢাকার ব্যবসায়ী কাজী রফিকুল ইসলাম রফিক ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসেছেন কুয়াকাটা। তিনি কয়েক মাস পূর্বে স্বপরিবারে কক্সবাজার ঘুরে এসেছেন। কুয়াকাটা সৈকতে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, এখানের সবকিছুতেই সাশ্রয়ী মনে হচ্ছে। বিভিন্ন সময় কুয়াকাটার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পর্যটকদের গলাকাটার যে বিষয়টি শুনেছি, আমার তা বিশ্বাস হচ্ছে না।
মৌলভীবাজার বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান চৌধুরী শাহিন ও চাকুরিজীবী রিয়াজ মোর্শ্বেদ রাজিব দুই বন্ধু স্বপরিবারে কুয়াকাটা বেড়াতে এসেছেন। তারা আবাসিক হোটেল স্যান্ডি’র ৫০১ ও ৫০২নং কক্ষে উঠেছেন। তারা জানান, ডাবল ননএসি দুইটি রুমে তাদের নিকট থেকে তিন হাজার টাকা ভাড়া নেয়া হয়েছে। তাদের কাছে এ ভাড়া অনেক কম মনে হয়েছে। অন্য কোথাও হলে কমছে কম চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়া নিতো।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও নিম্নমানের আবাসিক হোটেল অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ থাকলে বাড়তি টাকা আদায় করে। ভালো মানের আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ ছিলো না। ইতোপূর্বে কিছু পর্যটক না বুঝে অভিযোগ করে আসছেন। যখন পর্যটন মৌসুম থাকে না অথবা পর্যটক কম থাকে তখন হোটেল-মোটেল ৫০%-৬০% ভাড়া ডিসকাউন্ট দেয়। ভরা মৌসুমে এ ডিসকাউন্ট থাকে না, তখন রুম ভাড়া দ্বিগুন হয়। একই পর্যটক ভরা মৌসুমে এসে একই হোটেলে উঠে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন।

কুয়াকাটা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট এসোসিয়েশন (কুটুম) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির বলেন, ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের সেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ কঠোর অবস্থানে ছিলো। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে মনিটরিং করার কারণে এ বছর পর্যটকদের কোন অভিযোগ নেই। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়বে।

সৈকতের ফটোগ্রাফার, মটোরসাইকেল, অটোগাড়ি, অটোভ্যান চালকদের বিরুদ্ধে বাড়তি টাকা নেয়ার অভিযোগ আছে। তবে স্থানীয় চালকরা এ অভিযোগ অস্বিকার করে আসছেন। তারা বলছেন, বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মটোরসাইকেল, অটোগাড়ি, অটোভ্যান চালকরা এসে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। এ বিষয়টি অবগত হয়ে কুয়াকাটা পৌরসভার পক্ষ থেকে স্থানীয় চালকদের মাঝে নম্বরসহ বিশেষ পোশাক বিতরণ করা হয়েছে। পর্যটকরা হয়রানীর শিকার হলে অভিযোগ করলে চালককে সনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে কুয়াকাটা পৌর মেয়র আনোয়ার হাওলাদার বলেন, দূরের চালকরা পর্যটকদের হয়রানী করে আসছেন। আমরা বিষয়টি বুঝতে পেরে স্থানীয় চালকদের বিশেষ পোশাক দিয়ে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনেছি। যাতে অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে আমরা অভিযুক্ত চালককে সনাক্ত করতে পারি। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, এ বছর কুয়াকাটার ব্যবসায়ীরা আগত পর্যটকদের সেবা দেয়ার মানসিকতা নিয়ে ব্যবসা করছেন। যার কারণে পর্যটকরা কোন অভিযোগ করেননি। প্রশাসনসহ সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে কুয়াকাটার সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পরবে। আর এতে কুয়াকাটায় পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক) প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। কিন্তু এ বছর প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে পর্যটকদের তরফ থেকে এ ধরণের অভিযোগ আসেনি। সারা বছর সহনশীল ভাড়া থাকলে বেশি বেশি পর্যটক আসবে।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল মোতালেব শরীফ বলেন, আমাদের সংগঠনভুক্ত আবাসিক হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কখনও এ ধরণের অভিযোগ ছিলো না। কিছু নিম্নমানের হোটেলের বিরুদ্ধে আগে অভিযোগ ছিলো। কিন্তু এবার কোন পর্যটন অভিযোগ করেননি। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ পরিবর্তন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ হাসনাইন পারভেজ বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনফা আদায়ের অভিযোগ আমরা পাইনি। গত বছর কিছু অভিযোগ ছিলো। আমরা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। তারা আন্তরিকভাবে কাজ করায় এ পরিবর্তন এসেছে।

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পর্যটকদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা হয়রানির কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাদের সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।