কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্যমন্ডিত স্থাপনা সাগরে বিলীন

এইচ,এম, হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)।।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভুমি পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। এখানে রয়েছে একই স্থান থেকে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখার পৃথিবীর একমাত্র সৈকত। তাই কুয়াকাটা দেশিবিদেশি পর্যটকদের আগমন চোখে পড়ার মতো। ১৯৯৮ সালে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষনার পর সারা বিশ্বের পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষন করে কুয়াকাটা। বিনিয়োগকারীরা ও হোটেলমোটেল নির্মান করে কুয়াকাটাকে সৌন্দর্যের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানের অধীনে বনাঞ্চল, পর্যটকের বিশ্রামের জন্য গোলঘরসহ অধিকাংশ বেঞ্চি সাগর গিলে খেয়েছে। সৌন্দর্যমন্ডিত লেকসহ দুই পাড়ের নয়নাভিরাম বাগানটিও সাগর গর্ভে চলে গেছে। এখন জাতীয় উদ্যানের অফিস এরিয়ার বাউন্ডারি দেয়াল অর্ধেকটা ভেঙ্গে গেছে, বাকিটাও বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে। এক কথায় দুই তৃতীয়াংশ এলাকা সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। নারিকেল বাগানের অধিকাংশ নেই। নেই ঝাউ বাগান। কড়ই বাগান, শাল বাগান, তাল বাগানও সাগরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জেলে পল্লীর অর্ধেকটা বিলীন হয়ে গেছে। এখন ঝুঁকিতে রয়েছে সদ্য নির্মিত কুয়াকাটা ট্যুরিজম পার্ক, মসজিদ, মন্দিরসহ অর্ধশত দোকানপাট। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের পুর্ণিমা অমাবস্যার অস্বাভাবিক জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা গিলে খায় সৈকতের অন্তত ৪০-৫০ ফুট প্রস্থ এলাকা। যদিও সৈকত রক্ষায় ২০০৪ সাল থেকে শুধু পরিকল্পনা করে আসছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু এসব পরিকল্পনা কিংবা প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। কিছু দিন পুর্বে ৯৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা ডিপিপি আকারে মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ এবং ২০২০-২০২১ অর্থবছরে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ দিয়ে জরুরি প্রটেকশন দেয়া হচ্ছে। সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে ১২ শ’ মিটার এবং পশ্চিম দিকে তিন শ’ মিটার এলাকা জিও টিউব ও জিও ব্যাগ দিয়ে ঢেউয়ের ঝাপটা ঠেকাতে চেষ্টা চলে আসছে।

পর্যটন নগরী কুয়াকাটর সৌন্দর্যমন্ডিত নারিকেল বাগানের পর এবার বিলুপ্তির পথে ‘কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান’। আগত পর্যটকদের বিনোদনকেন্দ্র জাতীয় উদ্যানের অন্যতম আকর্ষন ঝাউবাগান। কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র দু’ কিলোমিটার দুরে পূর্বদিকে সৈকত লাগয়া চারদিকে ঝাউবাগানে ঘেরা ছিল ইকোপার্কের অবস্থান। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে কুয়াকাটার সৈকতঘেঁষা সংরক্ষিত বনাঞ্চল দিন দিন বিলিন হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাগরের ঢেউয়ের ঝাপটা মূল থেকে বালু সরে বাগানে গাছ উপড়ে পড়ছে। সৈকতে ভাঙ্গনের কারনে বিলীন হচ্ছে বনের গাছ।

উপকুলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালী কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, কুয়াকাটা বনের আয়তন প্রায় ২ হাজার ১৬৫ দশমিক ৮০একর। ২০০৫সালে সরকার এক জাতীয় উদ্যান ঘোষনা করে। ২০০৭ ২০০৮ অর্থবছরে প্রাকৃতিক বনসংলগ্ন এ সৈকত ঘেঁষে ১০হাজার হেক্টর ভুমির ওপর ঝাউবাগান গড়ে তোলা হয়। ২০১০সাল থেকে এই বনে নতুন বাগান করা হয়। তবে ২০০৭ সালে ঘুর্ণিঝড় সিডরে পর থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের ঝাপটায় ভাঙ্গনের মুখে পড়ে বনাঞ্চল। প্রতি বছর অন্তত ১০০একর বনভুমি ধবংস হচ্ছে। গত ১২বছরে কুয়াকাটা সংরক্ষিত বনের ১২৩৫ দশমিক ৮০ একর বনাঞ্চল সাগরে বিলিন হয়ে গেছে।

সম্প্রতি সরেজমিন সৈকত ঘুরে দেখা যায়, সিডর আইলার মতো সুপার সাইক্লোন কিংবা বর্ষা মৌসুমের অস্বাভাবিক জোয়ারে জলোচ্ছ্বাসে ইকোপার্কটি কয়েক দফায় দফায় বিধ্বস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে অভ্যন্তরীন মনোরম সাজানো লেকটির ছোট ছোট স্থাপনা। লেকটির সেতু, ঘাটলা, গোলঘর, শোভাবর্ধনের বাগান, বেঞ্চি, স্থায়ী ছাতা সব সাগর গিলে খেয়েছে। কুয়াকাটায় আসা পর্যটকরা এখানে এসে খুঁেজ পেতো প্রকৃতির বর্ণিল সুন্দরকে। যদিও এখন এটি শ্রীহীন হয়ে গেছে। তারপরও প্রতিদিন শত শত পর্যটক দর্শনার্থী কুয়াকাটার ইকোপার্কের খন্ডিত অংশের ঝাউবাগানে ঘুরে বেড়ায়।

কুয়াকাটা লাগোয়া ইকোপার্কের চারদিকে ঝাউবাগানে ঘেরা ছিল। কিছুটা পর পর দেয়া ছিল একটু বিশ্রমের জন্য বেঞ্চি। তার উপরে ছিল বিশাল সিমেন্টের স্থায়ী ছাতা। ইকোপার্কটির গহীন অরন্যের মাঝখান দিয়ে একাধিক চলার পথ ছিল। ছিল ছোট্ট ছোট্ট বক্স কালভার্ট। এরই মধ্যে ছিল বিশাল মনোরম লেক। লেকের মাঝখান দিয়ে চলচলের কাঠের ব্রিজ ছিল। যা পেরিয়ে যেতে যেতে দুইপাড়ের সীমাহীন সুন্দরের বিভিন্ন প্রজাতির বনজ, ফলজ, সৌন্দর্য বর্ধনকারী গাছের সমাহার দেখার সুযোগ ছিল। স্বচ্ছ টলমলে পানির মধ্যে বনবিভাগের ফাইবার প্যাডেল বোট ব্যবহার করত। দুইদিকেই ছিল বাঁধানো ঘাট। লেকের মধ্যে ছোট্ট টং ঘর ছিল। ইচ্ছে করলে পিকনিক পার্টির বহর ব্যবহার করতে পারত ইকোপার্ক এরিয়া। এসব এখন গল্পের মতোই রয়ে গেছে আগের দেখা পর্যটক-দর্শনার্থীর কাছে। কালের সাক্ষীর মতো ছোট ছোট স্থাপনার খুটিসহ স্ট্রাকচার বেলাভূমে দাঁিড়য়ে আছে। এসবও কোন এক উত্তাল ঢেউ কিংবা জলোচ্ছ্বাস গিলে খাবে। যাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে।

পর্যটক দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে কুয়াকাটায় ইকোপার্ক করা হয়। বনাঞ্চল ছাড়াও রয়েছে বিশাল বনভূমি ইকোপার্কের এরিয়ায় ছিল। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদফতরের উদ্যোগে প্রাথমিক পর্যায়ে দুই কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করা হয়। প্রথম দফায় ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে ২১টি ধাপের মধ্যে ২০টির কাজ সম্পন্ন করতে করা হয়। পরবর্তী ধাপে করা হয় কাঠের ব্রিজ। ওই সময়ে প্রধান ফটক নির্মাণ, মেঠোপথ প্রশস্থ করণ, বক্স ও পাইপ কালভার্ট, ভূমির উন্নয়ন, গোল ঘর ও জেটি নির্মাণ, ফিডার রোড, কার পার্কিং সুবিধা, পিকনিক সেড, টিকেট কাউন্টার, এপ্রোচ রোড, বিশুদ্ধ পানির সংস্থান, অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, সিটিং বেঞ্চ, লেক-পুকুর খনন ও বাইরের বিদ্যুৎয়ন। এছাড়া ম্যানগ্রোভ ও ননম্যানগ্রোভ এবং শোভা বর্ধনকারী বাগান, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়নে বাগান সৃজনসহ ৪৭ হেক্টর বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির লক্ষাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয়। এর বাইরে এক হাজার ৬শ’ ৬৭টি নারিকেল চারাও লাগান হয়। এসব এখন শুধু হারানো এবং স্বপ্নের অতীত।

সাগরের অব্যাহত ভাঙ্গনের সাগরে বিলিন হয়ে যাচ্ছে সৈকত লাগয়ো সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কুয়াকাটার সৈকত ঘেষাঁ নারিকেল বাগান, তালবাগান ও জাতীয় উদ্যানের ঝাউবাগান পর্যটকদের আকৃষ্ট করে তুলতো। কিন্তু ম্যানগ্রোভ বনের আকষনীয় এই স্থান গুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। জোয়ারের সময় উক্তাল সাগরের বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে উপড়ে পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। সাগরের ঢেউয়ের ঝাপটা সৈকতের গাছের মুল থেকে বালু সরে শিকড় বেরিয়ে রয়েছে। কোনো রকম দাঁড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু গাছ। সৈকতে বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য গাছের মুল। জোয়ার ঢেউয়ের আঘাতে বালুতে লুটিয়ে পড়ছে বড় বড় গাছ। সৈকতে পড়ে থাকা গাছগুলো উপকুলের লোকজন কেটে নিয়ে যাচ্ছে। নিচের অংশ সৈকতেই পড়ে রয়েছে। ইকোপার্কের বিভিন্ন স্থাপনা তার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার ডির্পাটমেন্ডের অনুষদের ডিন প্রফেসর ডা.আমিনুল হাসান বলেন, বাংলাদেশে জন্মে এমন প্রতিটি উদ্ভিদ প্রজাতিই দেশের জীববৈচিত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন। বাংলাদেশের বর্ধিত জনসংখ্যার প্রয়োজন মেটাতে প্রতিনিয়ত এদেশের জীববৈচিত্রের উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অনেক উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে এবং সেগুলো বিলুপ্তির সম্মুখীন হচ্ছে। নানানবিধ মানুষ্য সৃষ্ট কারনে ( যেমন নির্বিচারে বনভুমি ধবংস, মাত্রাতিরিক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ আহরন , উদ্ভিদের আবাসস্থলের পরিবর্তন) এবং প্রাকৃতিক কারনে ( যেমন ঘুর্নিঝড় , জলোচ্ছাস, অতিবৃষ্টি ,অনাবৃষ্টি তাপমাত্রা বৃদ্ধি) বাংলাদেশের অনেক উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব বর্তমানে হুমাকির মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় সৈকতে ভাঙ্গন প্রতিরোধের উদ্যোগের পামাপাশি নতুন করে বনায়ন করতে হবে। এ জন্য জলোচ্ছাস প্রতিরোধী ও লবনসহিষ্ণু গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে অপরুপ সৌন্দর্যের বেলাভুমি কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্যের পাশাপাশি রক্ষা পাবে বনাঞ্চল।

ঢাকা থেকে কুয়াকাটা ঘুরতে আসা পর্যটক উম্মে কুলসুম সারামনি জানান, সূর্যোদয় সুর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য অবলোকনের সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটায় আকর্ষনীয় ইকোপার্কটি ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সরকারের উচিত কুয়াকাটায় আকর্ষনীয় ইকোপার্কটি রক্ষা করা এখন ও সময় আছে।

কুয়াকাটা ট্যুারিষ্ট সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ রহমান তুষার বলেন, কুয়াকাটা এখন যে ভাবে ভাঙ্গছে তাতে এলাকার লোকজনসহ বিনিয়োগকারীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সৈকত রক্ষা করার জন্য ঝাউগাছসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ রোপন করা উচিত।

কুয়াকাটা পৌর মেয়র মো.আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, এ বছরে সাগরে রোলিং ও জলোচ্ছাসের চাপ বেশি। বর্তমানে জিওব্যাগ দিয়ে ভাঙ্গন রোধ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পটুয়াখালী বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মো.আমিনুল ইসলাম জানান, বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের কারনে গাছের গোড়া ক্ষয়ে বালি বের হয়ে যাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ইকোপার্কটির দুই তৃতীয়াংশ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এজন্য পানি উন্নয়ন র্বোডকে কয়েকবার জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন র্বোড নির্বাহী প্রকৌশলী মো.আরিফ হোসন বলেন, আমরা বর্তমানে জিওব্যাগ দিয়ে ভাঙ্গন রোধ ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি প্রজেক্ট ১২শত কোটি টাকার পরিকল্পনা গ্রহন করেছে তা যাছাই বাছাই করে প্রধান মন্ত্রী কাছে পাঠানো হবে।