কুয়াকাটা সৈকত: সাগর উওাল, তবুও লোনাজলে পর্যটকেরা

এইচ এম হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)।।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভুমি পর্যটনকেন্দ্র পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটা। এখানে রয়েছে একই স্থান থেকে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখার পৃথিবীর একমাত্র সৈকত। তাই কুয়াকাটা দেশি বিদেশি পর্যটকদের আগমন চোখে পড়ার মতো। ১৯৯৮সালে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষনার পর সারা বিশ্বের পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষন করে কুয়াকাটা। বিনিয়োগকারীরা ও হোটেলÑমোটেল নির্মান করে কুয়াকাটাকে সৌন্দর্যের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সৈকত। পদ্মা সেতু ঘিরে কুয়াকাটায় এখন নতুন সম্ভাবনা। তিন দিনের টানা ছুটিতে পর্যটকে মুখরিত সূর্যোদয়-সূর্যাস্তে বেলাভূমি সাগরকন্যা কুয়াাকাটা সমুদ্র সৈকতে ছুটে এসেছেন হাজারো পর্যটক । শুক্রবার (১৯ আগস্ট) ভোর থেকে সৈকতে ভিড় করছে নানা বয়সী মানুষ। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সৈকতে ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালিতে নেমেছেন হাজারো পর্যটক। কক্ষ খালি না থাকায় পর্যটকদের আবাসন সুবিধা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হোটেল-মোটেল মালিকরা। সৈকতে এসে বিনোদনপ্রেমীরা উৎসবে মেতেছেন এখানকার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। অনেকেই আবার সৈকতের নোনাজলে নেমে আত্মহারা। এতে আয় বেড়েছে সৈকতের হকারদের। অন্যদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ছিল জন্মাষ্টমীর ছুটি। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির থাকায় কুয়াকাটায় পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ছে। এখানকার অধিকাংশ হোটেল-মোটেল অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। থাকার জায়গা না পেয়ে পর্যটকরা আশপাশের বাসায় রাত্রি যাপন করছেন।

কুয়াকাটা বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ চলছে। এর প্রভাবে সাগরে প্রচন্ড উওাল। উওাল সাগরে গোসলে নামা নিষেধ এমন সর্তকবার্তা হিসেবে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই ভ্রমনে আসা পর্যটকদের। লোনা জলে শরীর -মন ভেজাতে তাঁরা ঝাঁপ দিচ্ছেন সাগরে। বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টির প্রভাবে কুয়াকাটা সমুদ্র উপকূল উত্তাল হয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে কূলে আঘাত হানছে। এর মধ্যে আজ শনিবার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সকালে উপকূলকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এমন বৈরী পরিবেশের মধ্যেই পর্যটকেরা ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সমুদ্রে গোসল করতে নামছেন। ট্যুরিস্ট পুলিশ, লাইফগার্ড কর্মীরা নানাভাবে চেষ্টা করেও পর্যটকদের সমুদ্র থেকে তুলে আনতে পারছেন না।

শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সৈকতের পয়েন্টে কয়েক হাজার পর্যটক লোনা জলে শরীর ভিজিয়েছেন। বিকালে এর সংখ্যা তিন থেকে চার গুন হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারনা করেছেন। তবুও বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল, ঝুঁকি নিয়ে গোসল করছেন পর্যটকেরা। এর মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে অনেক পর্যটক গোসল করতে নামছেন। পর্যটকদের এ বিষয়ে সর্তক করা হলেও তাঁরা বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না।

১৮ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত লোকে লোকারণ্য হয়েছে। তবে উওাল সাগরে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করছেন পরিবারের সব সদস্য মিলে। এদিকে সতর্ক থাকতে বারবার পরামর্শ দিচ্ছেন লাইফ গার্ড কর্মীরা। এছাড়া আগের তুলানায় প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা। বিশেষ করে , সাপ্তাহিক ছুটির দুদিন পর্যটকের আগমন বাড়ে কয়েক গুন। অগনিত দেশিবিদেশী পর্যটকের পদভারে এখন মুখরিত হয়ে উঠেছে পর্যটন নগরী সাগর কন্যা কুয়াকাটা। পর্যটন স্পটগুলোতে গমন উপযোগী যানবাহন এবং রাস্তাঘাটেও লেগেছে রঙের ছোঁয়া। সৈকতের শূণ্য পয়েন্ট থেকে দুই দিকে দুই কিলোমিটার জুড়ে পর্যটকে ঠাঁসা রয়েছে। কেউবা ঘুরে দেখছেন নৈসর্গিক দৃশ্য। কুয়াকাটার আকর্ষনীয় সমুদ্র সৈকত, সুর্যোদয় সুর্যাস্তের দৃশ্য, কুয়াকাটা ইকোপার্ক , রাখাইন মার্কেট, ছায়াঘেরা নারিকেল কুঞ্জ, লেম্বুর চরের শুঁটকি পল্লী, কুয়াকাটা সংলগ্ন মিশ্রীপাড়ায় অবস্থিত এশিয়ার সর্ব বৃহৎ বৌদ্ধ মূর্তি , সুন্দরবনের পুর্বাঞ্চল খ্যাত ফাতরার সবুজ বন, মম্বীপাড়ার সৎ সঙ্গের মন্দির, ঝাউবাগান, লেম্ফুর চর বনাঞ্চল, গঙ্গামতির লেকপাড় সর্বত্র পর্যটকের ভিড় রয়েছে। শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার, সীমা বৌদ্ধবিহারসহ দর্শনীয় স্পটসমুহ ঘুরে দেখছেন আগতরা।

বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলতেই পর্যটকরা ভিড় করছে সৈকতের বেলাভূমে। সূর্যাস্তের বিরল দৃশ্য অবলোকনের জন্য ভিড় করছেন আগত পর্যটক-দর্শনার্থী। পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে শীতের শুরুতেই পর্যটকদের আগমন শুরু হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেই চলছে পর্যটকদের বিনোদন। মূল সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করলেও সৈকতকে ঘিরে নেয়া হচ্ছেনা কোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড। পর্যটকদের বিশ্রাম কিংবা বসে সময় কাটানোরও নেই কোন ব্যবস্থা। কুয়াকাটা পৌরসভা ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ পর্যটনের উন্নয়নে নিচ্ছেনা কোন পদক্ষেপ। কুয়াকাটায় পর্যটকদের আগমন শুরু হলেও মূল সৈকতে এসেই থেমে যাচ্ছে পর্যটকদের সকল উচ্ছাস। মেঘ, রৌদ্রময় বিস্তীর্ন সৈকত ও সমুদ্রের মৃদু ঢেউয়ের পরশ তাদের ক্লান্তময় ভ্রমনের কিছুটা শান্তির পরশ বুলালেও অধিকাংশ সময় তাদের হোটেল বন্দী থাকতে হচ্ছে। রাতের কুয়াকাটা এখনও অন্ধকারই থেকে গেলো পর্যটকদের কাছে।

বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশি দোলনার মতো যখন দুলে দুলে তীরে আসতে থাকে তখন পূর্ব আকাশে সূর্যে হালকা রক্তিম বৃত্তটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। তখন প্রথম সূর্যোদয়ের আলোতে আলোতিক হয়ে পাল্টে যায় কুয়াকাটার সমুদ্রের নীলাভ জল বর্ন। লাল বর্ণ সূর্যটা অল্পক্ষণের মধ্যেই পূর্ণ বৃত্তে রূপ নেয়। এই নতুন সূর্য পুব আকাশে নিয়ে আসে এক অপরূপ শোভা। আকাশের ক্যানভাসে সদ্য ওঠা সূর্য, নিচে সমুদ্রের নীল জল, সুদীর্ঘ বেলাভূমি আর পাশে ঘন সবুজ ঝাউবনের সমন্বয়ে কুয়াকাটা সৈকত ফিরে পায় অপরূপ সৌন্দর্য। যেখানে দাঁড়িয়ে সুর্যোদয় সুর্যাস্তের অপরুপ ও নয়নাভিরাম এবং মনভোলানো দৃশ্য ও সৈকতের দাঁড়ালে চোখে পড়বে দিগন্ত জোড়া আকাশ আর সমুদ্রর রাশি রাশি নীল জল আর সমুদ্রের নীল জলের তরঙ্গায়িত ঢেউ কাঁচ ভাঙ্গা ঝন ঝন শব্দের মত আছরে পড়ছে কিনারায় ও উড়ে যাচ্ছে সাদা গাংচিলের দল এদিক ওদিক মাছ শিকারের জন্য লড়াকু জেলেরা ট্রলারে ও নৌকায় ছুটে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রে তা উপভোগ করা যায়। পর্যটকের আগমনে তিল ধারনের ঠাই নাই সৈকতের জিরো পয়েন্টে। সৈকতে আগত এ সকল পর্যটকরা সাগরের নোনা জলে গাঁ ভাসিয়ে আনন্দ উন্মাদনায় মেতেছেন। কুয়াকাটা ১৪০টি হোটেল, কাঁকড়া ও ফিশ ফ্লাইয়ের দোকান ২৩টি, শুটকি দোকান ২৮টি, পোষাকের দোকান ২০টি, ছবি প্রিন্ট ও এডিটিং স্টুডি ১০টি, বার্মিজ আটার ও চকলেট দোকান ৮০টি, ঝিনকের দোকান ১২০টি রয়েছে তাতে পর্যটকের পদভারে এখন মুখরিত। অনেকেই প্রিয়জনদের সাথে সেল্ফি তুলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেকে আবার সৈকতের বেঞ্চিতে বসে উপভোগ করছেন প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য।

গত দুই দশকের বেশি সময়ে এখানে আগমন ঘটে দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটকের। কিন্তু এখানে আসতে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভাঙ্গা সড়ক আর একাধিক সেতু পার করে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের জন্য ছিল নানা রকম বিড়ম্বনা। পদ্মা সেতু চালু কারনে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে স্থবির হয়ে থাকা নামি-দামি বিনিয়োগকারীদের স্থাপত্য। যা পর্যটকদের সেবার মান বাড়াবে আগের থেকে কয়েকগুণ। অবসান ঘটবে কুয়াকাটায় পৌঁছানোর সকল ধরনের প্রতিবন্ধকতা এমনটাই প্রত্যাশা পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকলের। নদী বেষ্টিত আধুনিক যুগের সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকা জেলার নাম ছিল পটুয়াখালী। স্বপ্নের পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিনাঞ্চলের পর্যটন শিল্পের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে সাগরকন্যা কুয়াকাটার দূরত্ব মাত্র ২৬৫ কিলোমিটার। যা ঢাকা থেকে কক্্রবাজারের চেয়ে প্রায় ১৫০কিমি কম। অতীত ঢাকা থেকে কুয়াকাটা সড়ক পথে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত আসতে ১৪টি ফেরি ছিল। দীর্ঘ দিন থেকে বরিশাল বিভাগের মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়ে এসব ফেরি পারাপার হয়ে রাজধানীতে আসা যাওয়া করতো। পদ্মা সেতু যাত্রা মধ্য দিয়ে এই পথে সেই ফেরি যুগের অবসান হলো। আর এ সেতুকে ঘিরে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি ব্যবসা বানিজ্যে ও ইতো মধ্যেই পর্যটন কেন্দ্র রুপ নিয়েছে কুয়াকাটা। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ঢাকা থেকে কুয়াকাটা ঘুরতে আসা শাহিত বলেন, তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সকালে সমুদ্রে নামেন। কিন্তু ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনি ছিটকে পড়বেন, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞা না মেনে সমুদ্রে নামা ঠিক হয়নি।

সিলেট থেকে ভ্রমণে আসা আলি উল্লাহ (৪০) বলেন, ‘সাগরের জলে শরীর ভেজানোর জন্য এত দূর থেকে এসেছি। সৈকতে নেমে দেখি বৃষ্টি, সমুদ্র ও উত্তাল। সবাই নেমে গোসল করছেন দেখে আমিও নেমেছি।’

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক মো.মোতালেব শরিফ বলেন, কুয়াকাটায় এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক অবস্থান করছে বলে তিনি জানান।

কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট জোনের সহকারি পুলিশ সুপার আ. খালেক বলেন, কুয়াকাটায় এতো বিপুল পরিমাণ পর্যটকের সমাবেশ ঘটে তবুও আমরা সকল পর্যটকের সবধরনের নিরাপত্তা দিতে বদ্ধপরিকর। বৈরী পরিবেশে সমুদ্র এখন উত্তাল। তাই পর্যটকেরা যেন সমুদ্রে নামতে না পারেন, সে জন্য সৈকতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাহারা বসানো হয়েছে। বালুচরে মাইকিং করে প্রচারণাও চলছে। তারপরও কিছু পর্যটক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উত্তাল সাগরে ঝাঁপ দিচ্ছেন। পর্যটক বলে তাঁদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করা যাচ্ছে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কলাপাড়া কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ আবদুল জব্বার শরীফ বলেন, সকাল থেকে কলাপাড়া থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় স্থল নিম্নচাপটি ভূখন্ডে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে ঝোড়ো হাওয়াসহ আরও বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ জন্য সমুদ্র উত্তাল রয়েছে। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে সর্বোচ্চ চার ফুট বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে আঘাত হানছে। এ জন্য পায়রা সমুদ্র বন্দর উপকূলকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।