গলাচিপার খালে বাঁধ দিয়ে মৎস্য শিকারের মহোৎসব, কৃষকের সর্বনাশ

হারুন অর রশিদ, গলাচিপা (পটুয়াখালী)।।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের মাটিভাঙ্গা খালের ওপর নির্মিত ব্রিজের (টু ব্যান্ড বক্স কালভার্ট) দুই পাশে বাঁধ দিয়ে চলছে অবাধ মৎস্য শিকার। ফলে খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের দু’টি গ্রামে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ভোগে পরেছে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। পানির নিচে তলিয়ে গেছে অন্তত পাঁচ হাজার একর রোপা আমন ধানের খেত। এরই মধ্যে কয়েক শ’ একর জমির আমন চারা পচে গেছে। শতাধিক পুকুরের মাছ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। বহু বাড়ি ঘর এখনও তলিয়ে আছে পানির নিচে। অভিযোগ করা হয়েছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল মৎস্য শিকারের মহোৎসবে মেতে ওঠায় কৃষকদের জন্য এ সর্বনাশ বয়ে এনেছে। এ বিষয়ে এলাকার কৃষকরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। প্রশাসন থেকে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে প্রায় ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে চরকাজল ইউনিয়নের মাটিভাঙ্গা খালের ওপর ৩৬ ফুটের টু ব্যান্ড বক্স কালভার্ট বা ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। জল চলাচল ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে এ ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও তা কতিপয় প্রভাবশালীর কারণে সীমাহীন জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে। নির্মাণ কাজ শেষ হতেই স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল ব্রিজের দুই পাশে বাঁধ দিয়ে খাল দখল করে মাছ ধরার মহোৎসব শুরু করেছে। ফলে এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। গত আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে দু’ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অবিরাম ভাড়ি বর্ষণ হয়েছে। সে সঙ্গে নদীতে অতি উচুমাত্রার জোয়ার বয়ে গেছে। এতে গোটা ইউনিয়ন বিশেষ করে ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বড় চরকাজল ও ছোট চরকাজল গ্রাম দু’টি পুরোপুরি পানির নিচে ডুবে গেছে। কোন কোন বাড়িঘর কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। শতাধিক পুকুরের মাছ পানির স্রোতে ভেসে গেছে। অন্তত পাঁচ হাজার একর জমির রোপা আমন ধানের খেত জলাবদ্ধতার কবলে পরেছে।

অভিযোগকারী কৃষকদের পক্ষে মোঃ জামাল মোল্লা জানান, জলাবদ্ধতায় দুই গ্রামের ১৫ হাজার মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। এরইমধ্যে কয়েক শ’ একর জমির রোপা আমনের চারা পচে গেছে। এখনও গোটা এলাকার আমন খেত পানির নিচে তলিয়ে আছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, উপজেলা কৃষি অফিসার সরেজমিনে তদন্তে এসে কৃষকদের ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেছেন। কৃষি অফিসার ব্রিজের বাঁধ খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রভাবশালীরা সে নির্দেশের তোয়াক্কা করছে না। বরং প্রভাবশালীরা ব্রিজের কয়েক মিটার দূরে সরকারী রাস্তা কেটে মাত্র ১০ ইঞ্চি ব্যাসের একটি পাইপ বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে জলাবদ্ধতার নিরসন হচ্ছে না।

কৃষক রাতুল ইসলাম অভিযোগ করেন, জরুরি ভিত্তিতে জলাবদ্ধতার নিরসন না হলে পাঁচ হাজার একর জমির ফসল তাদের হারাতে হবে। কৃষক জহির পেয়াদা জানান, এরই মধ্যে এক দফা আমনের চারা পচে গেছে। এখন বহু কৃষকের পক্ষে পুনরায় আমন চারা সংগ্রহ সম্ভব হবে না। কৃষক আঃ ওহাব পেয়াদা জানান, এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তিনি তার জীবনে দেখেন নি। এখনও বহু বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে আছে।

মোঃ দুলাল জানান, পুকুরগুলো থেকে কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। কৃষকরা আরও জানান, তাদের অনেকের পক্ষে হয়তো আর রোপা আমনের চাষ সম্ভব হবে না।

চরকাজল ইউনিয়নের সমাজকর্মী ও কৃষক মোঃ হাবিবুর রহমান মোল্লা বলেন, মাটিভাঙ্গা খালের ব্রিজের নিচ দিয়ে পানি ওঠা-নামা করতে পারে না। ব্রিজের পরিবর্তে বড় কালভার্ট দরকার ছিল। তাহলে এলাকায় জলাবদ্ধতা হতো না। এখন ওই ব্রিজের পাশ দিয়ে নিজেরা বিকল্পভাবে পানি সরানোর চেষ্টা করছি। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এ প্রসঙ্গে গলাচিপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এআরএম সাইফুল্লাহ বলেন, অতিবর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে কিছু এলাকায় কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। মাটিভাঙ্গা খালে বড় কালভার্ট দেয়া হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে গলাচিপা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, মাটিভাঙ্গা খালের টু ব্যান্ড বক্স কালভার্টের লে-আউট ও জায়গা নির্ধারণে সমস্যা হয়েছে। কেবলমাত্র ব্যক্তি স্বার্থে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। তারওপরে সেখানে প্রভাবশালীরা পানি চলাচলে বাধার সৃষ্টি করছে। বাঁধ খুলে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। তারা নিজেরা বাঁধ খুলে না দিলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

কৃষকদের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশিষ কুমার বলেন, আগামি দু’ তিনদিনের মধ্যে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে সব বাঁধ অপসারণ করা হবে। কাউকে কৃষকদের ক্ষতি করতে দেয়া হবে না।