‘দিদি’ এখন ‘বাংলার বাঘিনী’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
পশ্চিমবঙ্গের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আট থেকে আশি বছর বয়স্কেরও আদরের ‘দিদি’। রাজনীতির পাশাপাশি মমতা ইতিহাসে স্নাতক, ইসলামিক ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। এছাড়া, আইন ও এডুকেশনেও তিনি স্নাতক। অবসরে কবিতা লেখেন, ছবি আঁকেন। এখনও পর্যন্ত তার তিন শতাধিক ছবি বিক্রি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় চলে আসে ‘দিদি’র নাম। এবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কোমর বেঁধে নেমেছিলেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ, যে তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন নির্বাচনি প্রচারের সময়, কমিশনের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে ২৪ ঘণ্টা নামতে পারেননি প্রচারণায়। এতকিছুর পর টানা তৃতীয়বার বাংলার কুর্সিতে বসতে বড় জয় পেয়ে নিজেদের অবস্থান ও উচ্চতা আরও বাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান অন্যান্য রাজনীতিবিদদের থেকে একটু আলাদা। কোনও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নয়, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মমতার রাজনীতিতে হাতেখড়ি কলেজ জীবন থেকেই। এই সময়েই তার কংগ্রেসে যোগদান। ১৯৮৪-তে মমতার প্রথম লোকসভা জয়। ওই বছরে তিনি দক্ষিণ কলকাতা থেকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও এই জয় তিনি ধরে রাখতে পারেননি। ১৯৮৯-এর নির্বাচনে একই এলাকা থেকে দাঁড়িয়েও পরাজিত হয়েছিলেন মমতা। ১৯৯১-এর লোকসভা নির্বাচন হারানো আসন ফিরিয়ে দিয়েছিল তাকে। জয়ের এই ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রেখেছিলেন ২০০৯-এর সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত।

রাজনৈতিক জীবনের একেবারে গোড়ায় মমতা ছিলেন কট্টর কংগ্রেস সমর্থক। ১৯৯৭-এ সেই ভাবমূর্তিতে কিছুটা বদল আনেন। ওই বছরই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে পৃথক দল গঠন করেন। নাম দেন তৃণমূল কংগ্রেস। এছাড়া তিনি দু’বার দক্ষতার সঙ্গে রেলমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। এরই পাশাপাশি মমতা জোট বেঁধেছেন এনডিএ এবং ইউপিএ-র সঙ্গে। তবে নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুর আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে রাজ্য-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনই রাজ্যে তৎকালীন শাসকদল সিপিআইএমের শক্ত ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই আন্দোলনের হাত ধরেই পালাবদল ঘটেছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। ২০১১ সালে ৩৫ বছর ধরে বাংলায় চলতে থাকা একছত্র বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে বাংলায় প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনও বিমুখ করেনি তাকে। তৃণমূল একাই নির্বাচনে লড়ে সরকার গঠন করে।

২০২১ সালের নির্বাচনে জয় আরও পোক্ত করেছে মমতা ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিপত্য আরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিজেপির ‘ঘৃণার রাজনীতি’কে পরাস্ত করার জন্য তৃণমূল নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান ও উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। শিবসেনার মুখপাত্র ও সাংসদ সঞ্জয় রাউত তৃণমূল সুপ্রিমোর লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে টুইটে লিখেছেন, ‘বাংলার বাঘিনীকে অভিনন্দন। ও দিদি, দিদি, ও দিদি’।

এক নজরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের কালপঞ্জি:

১৯৮৪ – সিপিএমের হেভিওয়েট প্রার্থী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে হারিয়ে লোকসভায় প্রথম প্রবেশ।
১৯৮৯ – সাফল্যের পর ব্যর্থতাও দেখতে হল তাকে। মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে যাদবপুর কেন্দ্রেই হেরে যান।
১৯৯০ – হাজরাতে সিপিআইএম কর্মীদের হাতে জখম। মাথা ফাটে মমতার।
১৯৯১ – ফের লোকসভায়। দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রে বিপ্লব দাশগুপ্তকে হারিয়ে। নরসিমা রাও সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন, ক্রীড়া, যুবকল্যাণ, নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী হন।
১৯৯৩ – তার নেতৃত্বে মহাকরণ অভিযান। ১৩জন যুবকংগ্রেস কর্মী পুলিশের গুলিতে নিহত।
১৯৯৭ – কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন।
১৯৯৯ – বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের শরিক হন। রেলমন্ত্রী হন তিনি।
২০০১ – এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট। ফের যোগ দেন এনডিএ-তে।
২০০৪ – এনডিএ সরকারের কয়লা এবং খনি দফতরের মন্ত্রী। লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস কেবলমাত্র একটি আসনে জয়ী।
২০০৬ – সিঙ্গুরে টাটাদের প্রস্তাবিত কারখানায় যাওয়ার সময় তাকে বলপূর্বক বাধা দেওয়া হয়। এরপর বিধানসভায় ভাঙচুর। প্রতিবাদে কলকাতায় ২৫ দিনের অনশন।
২০০৮ – পঞ্চায়েত নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদে জয়ী তৃণমূল কংগ্রেস। নন্দীগ্রাম এবং সিঙ্গুরেও জয়ী।
২০০৯ – লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল এবং কংগ্রেস জোট ৪২ টি আসনের মধ্যে ২৬টিতেই জয়ী।
২০১০ – কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী তৃণমূল কংগ্রেস।
২০১১ – বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এবং কংগ্রেস জোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২২৭ আসনে জয়ী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা।
২০১৬ – একা নির্বাচনে লড়ে বাম-কংগ্রেস জোটকে উড়িয়ে দেয় তৃণমূল। ২৯৪ আসনের ২১১টিতেই জয়ী তৃণমূল। টানা দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
২০২১- টানা তৃতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বিজেপি-তে যাওয়া শুভেন্দুকে পরাজিত করেন তিনি। মাত্র ১ হাজার ২০১ ভোটে নন্দীগ্রামে জিতেছেন মমতা।
সূত্র-টাইমস অব ইন্ডিয়া, ওয়ান ইন্ডিয়া, জি নিউজ।