পদ্মাসেতুর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা থেকে বঞ্চিত মুলাদী উপজেলার লাখ লাখ মানুষ

ভূঁইয়া কামাল, মুলাদী (বরিশাল)।।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুল আলোচিত একটি বিষয় ছিল পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন। গত ২৫ জুন ২০২২ উদ্বোধন হয়েছে আমাদের স্বপ্নের পদ্মাসেতু। স্বপ্নকে বাস্তবায়নে রূপ দিয়েছেন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলা হয়ে থাকে দেশে ২১ জেলার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে এই পদ্মাসেতু।

পদ্মাসেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা। পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন করতে নানামুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। তার মধ্যে সংযোগ সড়ক নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, নদী শাসন, সেনানিবাস নির্মাণ, দুই পাশে থানা ও মসজিদ নির্মাণ, পরিবেশগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করা, গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, যাদুঘর স্থাপন ইত্যাদি। সবকিছু মিলিয়ে পদ্মাসেতুর সুবিধাভোগী আমরা।

কাগজে কলমে বা কথায় যদিও বলা হয়ে থাকে ২১ জেলার মানুষ সুবিধা পাচ্ছে পদ্মাসেতুর। কিন্তুু অনেক সময় আলোর নিচেই থেকে যায় অন্ধকার। এই ২১ জেলার অনেক এলাকার মানুষই যোগাযোগ ব্যবস্থায় পদ্মাসেতুর সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তার মধ্যে মুলাদী উপজেলাসহ হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও কাজিরহাট থানা রয়েছে।

পদ্মাসেতু হলেও বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলাবাসী তেমন কোন সুযোগ সুবিধা পায়নি। পদ্মাসেতু হয়ে শরীয়তপুর জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলার সংযোগ সড়কগুলোর বেহাল দশা। সেখানে যাত্রীবাহী পরিবহন চলাচল খুবই কষ্টের বিষয়।

পদ্মাসেতু হয়ে বরিশাল জেলার মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় যেতে হয়। এছাড়াও বরিশাল জেলার মেহেদীগঞ্জ উপজেলা, কাজিরহাট থানা ও ভোলা জেলার কিছু অংশের যাতায়াত এই পথে খুবই সহজ। শরীয়তপুর থেকে গোসাইরহাট হয়ে বরিশালের মুলাদী উপজেলা ও হিজলা উপজেলা খুব কাছে। কিন্তু সেখানে একমাত্র বাধা আবুপুর, মৃধারহাট ও মীরগঞ্জ নদী। বর্তমানে হাজার হাজার যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে পার হচ্ছে। এ পথ দিয়ে এভাবে মানুষ যাচ্ছে মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও কাজিরহাটসহ বেশকটি এলাকায়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য মৃধারহাট ও মীরগঞ্জ সেতু নির্মিত হলে এলাকার মানুষের পথের দূরত্ব অনেকাংশেই কমে যাবে এবং অর্থও সাশ্রয় হবে। এখন ঐ এলাকার অনেকেই বলছে সেতুটি ভেদুরীয়া মৃধারহাট হলে নদী শাসন ও এ্যাপ্রোজ সড়ক অনেকটাই কমবে। কেউ কেউ বলছে ছবিপুর বোয়ালিয়া দিয়ে সেতুটি হলে সরকারের খরচ বাঁচবে অনেক। কিন্তু ঐ এলাকায় সাধারণ মানুষের কথা হল সরকারের যেখান দিয়ে সুবিধা সেখান দিয়েই সেতু নির্মাণ করা হোক। তাহলে পদ্মাসেতুর শতভাগ সুবিধা পাবে এই এলাকার সাধারণ মানুষ। মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও কাজীরহাট এলাকায় যেতে আরেকটি উপায় হল, ঢাকা থেকে পদ্মা ব্রীজ হয়ে বরিশাল বিমানবন্দর এলাকায় অর্থাৎ রহমতপুর বাসষ্ট্যান্ড নেমে মীরগঞ্জ নদীর পাড় হয়ে যেতে হয়। সেখান দিয়ে ফেরী, ট্রলার বা নৌকায় পার হয়ে যেতে হয় মুলাদী প্রান্তে তারপর হিজলা ও কাজীরহাট। তাতে একজন যাত্রীকে পারি দিতে হয় বহুপথ। আর মৃধারহাট সেতু নির্মিত হলে দূরত্ব অনেক কমবে পাশাপাশি মানুষের নানাবিধ কষ্ট লাঘব হবে।

মুলাদী উপজেলার একটি দ্বীপ ইউনিয়ন রয়েছে। চারপাশে নদী বেষ্টিত এই ইউনিয়নে সরাসরি কোন সড়ক যোগাযোগ এতদিন ছিল না। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মোঃ এমদাদুল হকের প্রচেষ্টায় রামারপোলে উচ্চতর বাজেটের একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেই সেতুটি চালু হলে ভুরঘাটা, কালকিনি হয়ে মানুষ নাজিরপুরে যাতায়াত করবে। পাশাপাশি মুলাদীর পাতারচর এলাকার পাইতিঘাট থেকে কুতুবপুর সেতুটি হলে নাজিরপুর হবে একটি ঐতিহাসিক পর্যটন এরিয়া। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ইমদাদুল হকের হাতের ছোয়ায় নাজিরপুর বাংলাদেশের একটি মডেল ইউনিয়ন। এরকম অভ্যন্তরিণ আরও ২/১ ছোট ছোট সেতু নির্মাণ হলেও সংশ্লিষ্ট রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হলে মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও কাজিরহাট থানার মানুষের জন্য পদ্মাসেতুর সেবা পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের দৌড়গোড়ায়। মৃধারহাট ও মীরগঞ্জ সেতুটি নির্মিত হলে এই পথে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা যাতায়াত অনেক সহজ থেকে সহজতর হবে। বহুমুখী উন্নয়ন হবে এলাকার।

বরিশালের মীরগঞ্জ ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন ১টি ফেরি দিয়ে শতশত যানবাহন চলচাল করে। পর্যাপ্ত সংখ্যক ফেরি না থাকায় অধিকাংশ সময়ই পারাপারের ভোগান্তি পোহাতে হয় মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের হাজার হাজার যাত্রীদের। ভোগান্তি কমাতে তিন উপজেলার বাসিন্দারা মীরগঞ্জ সংলগ্ন আড়িয়াল খাঁ নদীতে একটি ব্রীজ নির্মাণের জন্য দীর্ঘদিনের দাবি ৩টি উপজেলার লক্ষাধীক মানুষের। প্রায় ৪ কিলোমিটার আড়িয়াল খাঁ নদীটি পাড় হতে ফেরির সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট।

মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও কাজিরহাট থানাসহ ৩টি উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের একটি উপায় এই মীরগঞ্জ ফেরিঘাট। সারাপথ নিরাপদে আসতে পারলেও মীরগঞ্জ ফেরিঘাটের কাছে এলেই সবাই থমকে গিয়ে, ফেরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এর ফলে অনেক জরুরি কাজেও সহজে যাতায়াত করা স¤ভব হয় না। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সর্বস্তরের মানুষ।

মীরগঞ্জ খেয়াঘাটের সাবেক ইজারাদার, মুলাদী পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুলাদী প্রেসক্লাবের সভাপতি আলমগীর হোসেন সুমন রাড়ী বলেন, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমানোর জন্য ট্রলারঘাটের দায়িত্ব নিয়ে ছিলাম। ট্রলার চালক সিন্ডেকেটের জন্য যাত্রীদের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়। বৃহত্তর এই অঞ্চলের সুবিধার জন্য আড়িয়াল খাঁ নদীতে ব্রীজ প্রয়োজন।

মুলাদী ও হিজলা থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মতিউর রহমান বলেন, মীরগঞ্জ ফেরিঘাট আড়িয়াল খাঁ নদীতে ব্রীজ না থাকায় অনেক সময় জরুরী কাজে বরিশাল যেতে অনেক সময় লেগে যায় ও বরিশাল থেকে আসতেও দেরী হয়। এ সড়ক দিয়ে সাধারণ যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর গাড়িও চলাচল করে। কিন্তু মীরগঞ্জ ফেরিঘাটের কাছে আসার পর অন্য সবার মতো তাদেরও থমকে যেতে হয়। আড়িয়াল খাঁ নদীতে ব্রীজ থাকলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির অনেক উপকৃত হবে।

বরিশাল বিএম কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের অনার্সের ছাত্র মোঃ রাফিউর রহমান সিরাত বলেন, মীরগঞ্জ ফেরিঘাটে ব্রীজ হলে মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ও কাজিরহাট থানার শতশত ছাত্র-ছাত্রী প্রতিদিন নিজ বাড়ী থেকে আসা-যাওয়া করে বরিশালে অল্প খরচে লেখাপড়া করতে পারে।

মুলাদী সরকারী কলেজের অনার্সের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম, মিরাজ, মহিমা ইসলাম মহোনা, শাহজাদা সরদার বলেন, মীরগঞ্জ ফেরিঘাটে জরুরী ব্রীজ প্রয়োজন। আমরা লেখাপড়া করি মুলাদীতে কিন্তু পরীক্ষার কেন্দ্র বরিশাল বিএম কলেজসহ অন্যান্য কলেজে। নির্ধারিত সময় গাড়ী ও ফেরি চলাচলের জন্য আমাদের অনেক ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। যদি ব্রীজ থাকে তাহলে আমরা যখন তখন দ্রুত বরিশাল যেতে পারি এবং আসতেও পারি। মুলাদী ও হিজলা কলেজের অনার্সের সকল ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষার জন্য বরিশাল যেতে হয়। তাই এলাকাবাসীর দাবী জরুরী ভিত্তিতে মীরগঞ্জে আড়িয়াল খাঁ নদীতে ব্রীজ প্রয়োজন।