পহেলা আষাঢ়, এ যেন ঘনঘটা মেঘের তরে সবুজের সমাহার

কে.এম রিয়াজুল ইসলাম, তালতলী।।
গ্রীষ্মের খরতাপের ধূসর নাগরিক জীবন আর প্রকৃতিতে প্রাণের স্পন্দন জাগায় বর্ষা। ঋতু পরিক্রমায় বাংলার বুকে এসেছে প্রেমময়, কবিতাময়, উচ্ছল বরষা। গাছ-গাছালি, লতাগুল্মে প্রজাপতির ডানার মতো নানা রঙের ছাট। প্রকৃতির রং-রূপ-মাদকতার ফোটে বকুল, মেলে চালতা ফুলের সুবাস। ঝোপ-ঝাড়ে অলকানন্দার উঁকি। সোনারঙের পাঁপড়ি চুইয়ে ঝড়ে বৃষ্টির কণা। ঘাসের বুকে উঁচিয়ে থাকা কলাবতীতে লতিয়ে উঠেছে নীল অপরাজিতা। দাবদাহের ধকল আর জরা-জীর্ণতা ধুয়ে-মুছে বর্ষা নাগরিক জীবনে ফেরায় প্রশান্তি। সময়ের পরিক্রমায় আজ পহেলা আষাঢ়।

বর্ষার বিষণ্নতা ম্লান করে কাননে ফুটেছে কাঠগোলাপ আর জুঁই-টগর।কদম-কামিনির মৌতাত বাতাসে বাতাসে। বর্ষার আগমনে গ্রীষ্মের খরতাপ ধুয়ে ফিরবে প্রশান্তি, এ প্রত্যাশাই সবার।

আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। কবিগুরু বৃষ্টি বন্দনায় বলেছেন, গ্রীষ্মের ধুলোমলিন জীর্ণতাকে ধুয়ে ফেলে গাঢ় সবুজের সমারোহে প্রকৃতি সেজেছে পূর্ণতায়। নদীতে উপচে পড়া জল, আকাশে মেঘের ঘনঘটা এরই মাঝে হঠাৎ মেঘরাজের গর্জন। মেঘের ডাকে যেন বৃষ্টি কাঁদছে। যে কথাটি বলি বলি করেও বলা হয় না, বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল নিয়ে যেন তারই আসার অপেক্ষা।

বর্ষার সতেজ বাতাসে জুঁই কামিনি, বেলি, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা, নাম না জানা আরও কত ফুলের সুবাস। লেবু পাতার বনেও যেন অন্য আয়োজন। প্রকৃতি থেকে শুরু করে গান, কবিতায় বাঙালি জীবন প্রবাহের প্রতিটি পরতে রয়েছে বর্ষার প্রত্যক্ষ প্রভাব।

রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে/ কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে/ কদম তমাল ডালে দোলনা দোলে/ কুহু পাপিয়া ময়ুর বোলে/ মনের বনের মুকুল খোলে/ নট-শ্যাম সুন্দর মেঘ পরশে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষায় প্রকৃতি ও প্রাণীকুলে পরিবর্তনে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন এমনটি।

আর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন- ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছো দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান, মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে, এই-যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান।’

রবি ঠাকুরের এ গানে বৃষ্টি আর কদম যেন দু’জন দু’জনের চিরদিনের মিতা। একজন আরেকজনের শুভেচ্ছাদূত।

বাদল দিনে প্রথম কদম ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক পঞ্জিকার হিসেবে আজ রবিবার (১৪ জুন) পহেলা আষাঢ়। মানে বর্ষা ঋতুর প্রথম দিন। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল অর্থাৎ বর্ষা ঋতু। এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য বৃষ্টি ঝরা আকাশ, কর্দমাক্ত মাঠ, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে পরিপূর্ণ হওয়া।পুকুরে জল জমে থৈ থৈ করে। নদীর তীর উপচে কখনও বা ধেয়ে আসে বন্যা। তখন গ্রামের সাধারণ লোকজনের কষ্টের শেষ থাকে না। তারপরও গ্রীষ্মের তাপদাহ এড়িয়ে বর্ষায় বারিধারায় শান্তি খুঁজে পায় মানুষ। বর্ষা আনন্দ-বেদনার সারথী। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পলির আস্তরণে বর্ষা আনে জীবনেরই বারতা। তাই বর্ষাকে স্বাগতম।