পেটে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, বেদনার আড়ালে ঈদ!

মামুন হোসেন, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর)।।
‘একবেলা খাবার কপালে জোটবে কিনা তা নিয়ে প্রতি মুহূর্তে চিন্তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। যেখানে পেটে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, সেখানে কিসের ঈদ। বছর ঘুরে এলেও ছেলে মেয়েদের সামনে একটুকরো গরুর গোস্ত তুইলা দিতে পারি না। তাদেরকে বলছি, ঈদের দিন সকালে মানুষ গোস্ত দান করলে তোদের গোস্ত এনে দিবো। তাই ওরাও ঈদের সকালে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গোস্ত আনতে যাইতে চায়। কিন্তু সারাদিন গোস্ত টোকাইলে শেষ বেলা রান্না করে খাইতে খুবই কষ্ট হয়। আসলে গরীবের কপালে আবার ঈদ অ্যয় নাকি? ঈদ আইলে ম্যোগো বেদনা অ্যয়।

রোববার সকালে কথাগুলো আক্ষেপের স্বরে বলছিলেন ষাট উর্ধ্ব বিধোবা রহিমা ও বকুল বেগম। শুধু রহিমা ও বকুল নয়, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার মেদিরাবাদ তারাবুনিয়ার অশ্রয়ণ প্রকল্প সহ বিভিন্ন অশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের উঠানে বসে কথা হয় অন্তত ২০ জন অসহায় দরিদ্র আশ্রিত ব্যক্তিদের সাথে। তাদের মধ্যে হালিমা ( ৩৫),নুপুর (৪০) ও জান্নাতী বেগম (৩৪) বলেন, ‘ভাই আমি স্বামী হারা মানুষ। আমাদের দুই তিনটি করে ছেলে মেয়ে আছে। এদের সবাই ১০/১২ বছরের নিচে বয়ষ। তারা ঈদুল ফিতরে কোরবানির গোস্ত খাইবার বায়না করেছে। তাদের গোস্ত এনে দিতে পাড়লে মোড়া তৃপ্তি পেতাম। ’দরিদ্র হায়দার আলী (৬৫) বলেন, ‘ক-দিন পরই ঈদ, কিন্তু অভাবের কারণে মনে আনন্দ আসেনা। আমরাও চাই বছরে একটি ঈদ আনন্দে করতে কিন্তু ভাগ্য আমাদের সহায় না। ঈদে গোসত খাওয়া তো আমাদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। ’সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ৮ শত ১ টি অসহায় দরিদ্র পরিবার অশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করছে। আশ্রিত এই মানুষ অধিকাংশ বেকার, কেউ কেউ বিধোবা আবার কেউ কেউ স্বামী পরিত্যাক্তা। এসব পরিবারগুলোর কষ্টের শেষ নেই। দরিদ্র এই পরিবারের মাঝে বেদনার আড়ালে অন্যরকম ঈদ কাটছে।

আশ্রিত এলাকায় গেলেই চারপাশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন শত শত দরিদ্র মানুষ। কাছে যেতেই ঘিরে ধরতে শুরু করছেন সহায়তার জন্য নানা আকুতি মিনতি। তাদের সাথে রয়েছে অনেক শিশুরাও। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে জানা যায়, স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ সুবিধা বঞ্চিতদের বুকে বঞ্চনার ক্ষত থেকে যায় সবসময়ই। তারপরও ঈদ এলে বিত্যবান সহ সব মানুষের মধ্যে আনন্দের দোলা দেয়। কিন্তু এ বছর দ্রব্যমূল্য উর্ধ্বগতির কারনে মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত বছর যারা পশু কোরবানি করেছে তাদের মধ্যে অনেকেই এ বছর কোরবানি করতে পারছে না। এ বছর বেদনার আড়ালে বধ্যবিত্তদের অন্যরকম ঈদ উদযাপন করবে। স্থানীয়রা বলছেন , ঈদের দিন নামাজ আদায় করে অনেক বধ্যবিত্ত ব্যক্তিরা কোরবানি না করতে পারায় ঘরে বসে সময় কাটাবে। আবার অনেক পুরুষদের দেখা যাবে ঈদগাহে নামাজ পড়া শেষ করে নিত্যদিনের রোজকারের সন্ধানে ছুটে চলতে।

আবার অনেকে রিকশা কিংবা ভ্যান ঠেলার কাজে নিয়োজিত হবে। অথবা অন্য কোনো কাজে। কেউ কেউ পশুর মাংস ছাড়ানোর কাজে লেগে যাবে। এদের বাইরে শিশু ও বয়স্কদের অনেকে সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে মাংস সংগ্রহ করে ঈদের দিনটি কাটাবেন। এভাবেই গরীবের ঈদের ভিন্ন ধারার জীবন চিত্র দেখা যায় ঘাও গ্রামে। আশ্রিত দরিদ্র শীলা জানান, ভাই কি করব কার কাছে গিয়ে অভাবের কথা বলব। এক বছরেও ছেলে মেয়ের সামনে মাছ গোস্ত খেতে দিতে পারিনি। কেউ কোন সহযোগিতা করে না। সন্তান অসুস্থ ঘরে খাবার নাই। সামনে ঈদ। মাঝে মধ্যে মনে হয়, কেন পৃথিবীতে আসলাম? বাবা- মা হয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে পারি না। বিছানায় অসুস্থ্য শিউলী বেগম বলেন, শুনছি উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম ভাল মানুষ ও ধানবীর। তাকে এই ঈদে তাদের পাশে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।’