বরিশাল বিএনপিতে সরোয়ার-যুগের অবসান ঘটলো যেভাবে

রূপালী ডেস্ক।।
বরিশালে বিএনপির রাজনীতিতে মজিবর রহমান সরোয়ারের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। দলের ভেতরে বিরোধিতা থাকার পরও তিন দশক কৃতিত্বের সঙ্গে কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন তিনি। দলীয় পদ-পদবি থেকে শুরু করে নির্বাচনী রাজনীতিতে সরোয়ার-প্রভাব ছিল একচ্ছত্র। গত কয়েক বছরে তাঁর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এককাট্টা হয়ে মাঠে নামেন সরোয়ারের বিরোধী বলয়ের নেতারা। তাঁদের নানামুখী তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত বরিশাল বিএনপি থেকে কার্যত ছিটকে পড়লেন সরোয়ার। তাঁকে বাদ দিয়েই গঠন করা হয়েছে বরিশাল মহানগর এবং উত্তর ও দক্ষিণ জেলার নতুন কমিটি। বুধবার কেন্দ্র থেকে ঘোষিত নতুন কমিটিগুলোতে স্থান পাননি তাঁর কোনো অনুসারীও।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরোয়ার বলেন, ‘শুনেছি কমিটি দিয়েছে। আগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। তাই কমিটি পরিবর্তন হয়েছে। ভেবেছিলাম সম্মেলন করা যাবে, না হলে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।’ কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করে সদ্যবিলুপ্ত বরিশাল মহানগর বিএনপির এই সভাপতি বলেন, ‘অন্যান্য জায়গায় যেভাবে কমিটি করেছে, সেভাবেই কাগজে লিখে কমিটি পাঠিয়ে দিয়েছে।’

নতুন নেতাদের মধ্যে নগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘বরিশালে বিএনপির রাজনীতিতে গ্রুপিং থাকবে না। সবাইকে নিয়ে রাজনীতি করব।’

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শ্রমিক রাজনীতি দিয়ে বিএনপিতে সম্পৃক্ত হন সরোয়ার। এরশাদের আমলের বেশির ভাগ সময় হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় কারাগারে ছিলেন তিনি। সে সময় শ্রমিক দলের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার বরিশাল-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পান তিনি। কিন্তু ভোটের আগে তাঁকে সরিয়ে ওই আসনে মোশারফ হোসেন মঙ্গুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে কয়েক মাস পরেই ভাগ্য খুলে যায় সরোয়ারের। সদর আসনের সাংসদ আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর উপনির্বাচনে ওই আসনের সাংসদ হন সরোয়ার। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সরোয়ারের বদলে বিএনপির মনোনয়ন পান আবদুর রহমান বিশ্বাসের ছেলে নাসিম বিশ্বাস। বছর দুয়েক পর নাসিমের মৃত্যুতে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান সরোয়ার। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাংসদের পাশাপাশি হুইপ ও জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিত্ব পান। পরবর্তী সময়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। দ্বিতীয় দফায় উপনির্বাচনে সাংসদ হওয়ার পরই বরিশালে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠন গড়ে তোলেন একক আধিপত্য। যখন যে পদ চেয়েছেন, পেয়েছেন। অনুসারীদেরও বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সরোয়ারের মতো একই সঙ্গে একাধিক পদে থাকার রেকর্ড নেই আর কারও। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব। বরিশাল মহানগর বিএনপির সদ্যবিলুপ্ত কমিটিতেও সভাপতি ছিলেন তিনি। এর আগে জেলা কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি।

সরোয়ারকে ঠেকাতে ২০১৯ সালের দিকে নব্বইয়ের দশকে ছাত্রদলের রাজনীতি করা একাধিক নেতা জোট বাঁধেন। চলতি বছরের শুরুতে সরোয়ারবিরোধী এই বলয়ে যুক্ত হন নগর বিএনপির তৎকালীন নেতা মনিরুজ্জামান ফারুকসহ অনেকে। পরবর্তী সময়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একটি বড় অংশও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাঁদের মধ্যে সরোয়ারের আস্থাভাজন অনেকেও ছিলেন।

তাঁদের অভিযোগ, নিজের অবস্থান সমুন্নত রাখতে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের পদে বসিয়েছেন সরোয়ার। বিরোধী বলয়ের এই নেতারা সমর্থন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার শিরিনেরও। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও প্রচারে শেষ পর্যন্ত নতুন কমিটি থেকে ছিটকে পড়লেন সরোয়ার।

নতুন কমিটি: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনুমোদিত বরিশালের তিনটি কমিটি প্রকাশ করা হয়। কমিটি ঘোষণার তথ্য নিশ্চিত করেছেন বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন।

বিএনপি মহানগরের নতুন কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সদ্যবিলুপ্ত কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুককে। ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন আলী হায়দার বাবুল এবং সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন মীর জাহিদুল কবির জাহিদ। তাঁরা সবাই বিএনপিতে সরোয়ারবিরোধী হিসেবে পরিচিত।

বরিশাল দক্ষিণ জেলায় আহ্বায়ক হিসেবে মজিবর রহমান নান্টু এবং সদস্যসচিব পদে আক্তার হোসেন মেবুলের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রদলের সাবেক এ দুই নেতা দীর্ঘদিন ধরে সরোয়ারবিরোধী বলয়ে রাজনীতি করছেন।

উত্তর জেলা বিএনপিতে দেওয়ান মো. শহিদুল্লাহকে আহ্বায়ক এবং ভিপি মিজানুর রহমান মুকুলকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। বিএনপির পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বরিশালে পরিচিতি রয়েছে এই দুজনের। তারাও সরোয়ারের বিরোধী হিসেবে মাঠে সক্রিয় ছিলেন।

এর আগে ২০১৩ সালে নগর, ২০১৪ সালে দক্ষিণ জেলা এবং ২০১০ সালে উত্তর জেলা বিএনপির সর্বশেষ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।