বাঙলা ভাগ হলো

FOYSAL

ফয়সাল মাহমুদ।।
বাঙলা ভাগ বইয়ের লেখক জয়া চ্যাটার্জী।সুবিশাল এই গবেষণামূলক প্রবন্ধের লেখক দেখাতে চেয়েছেন বাংলা ভাগের গল্পটা শুধুই কি ধর্মের বিভক্তির উপাদান।ঠিক, কি কি কারণে- ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ করার বাবু শ্রেণী ও ভদ্রলোক সম্প্রদায় ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ এর পক্ষে কথা বলে?হঠাৎ এই মানসিকতার পরিবর্তন কিভাবে গড়ে উঠলো? ধর্ম দাঙ্গাকে একপেশ কার্যকর না দেখে আরো কি কি বিষয় এর সাথে জড়িত আছে তা নিয়ে ব্রাক্ষমণ গ্রন্থটি বাঙলা ভাগ হলো।লেখক দেখাতে চেয়েছেন ভারতের জাতীয় সমস্যা ঠিক কীভাবে সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার্থে ত্বরান্বিত করে?

প্রথমেই আসে সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ যার অভাবনীয় ক্ষতির কারণ হিন্দু ভদ্রলোক অনুভব করে গোড়া থেকেই।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ এ স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু শ্রেণীর স্বার্থ দারুণভাবে ক্ষুন্ন হয়।বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায় কে ভদ্রলোক সম্প্রদায় কখনোই রাজনৈতিক মাঠ দখলের সুযোগ দিতে চাইনি।১৯৩২ এর ম্যাকডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দুদের দেওয়া হয় ৮০ টি আসন,যা ছিল মোট আসনের ৩২ ভাগ।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ছিল মূলত হিন্দু বর্ণ শ্রেণীর ভোট রাজনীতিতে অবস্থান হারানোর ভয়।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ এর পূর্ববর্তী ১৯১৯ সালের “বেঙ্গল ভিলেজ সেল্ফ গভর্মেন্ট” এর মাধ্যমে এই সুযোগে মুসলিম মফস্বল শিক্ষিত শ্রেণীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে এবং প্রতিনিধিত্বশীল একটি সমাজ ব্যবস্থার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাই।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ এর রেশ কাটতে না কাটতেই এরই মাঝে হয় পুনা চুক্তি।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ এরপর পুনা চুক্তি দেখা দেয় বাঙালি বর্ণহিন্দুদের নিকট মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে।১৯৩২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গান্ধীর রোয়েদাদ এর বিষয়টি নিয়ে আমরণ অনশন শুরু করেন। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ এরপর পুনা চুক্তি ছিল মূলত তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচক মন্ডলী নির্ধারণ। এই পুনা চুক্তি তে বাঙলায় মোট ৮০ টি হিন্দু আসনের মধ্যে ৩০ টি আসন তফশিলি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত করা হয়।

এদিকে বেঙ্গল কংগ্রেস পুনা চুক্তি ও রোয়েদাদা এর বিষয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ও পুনা চুক্তি কংগ্রেস হাইকমান্ড এবং বেঙ্গল কংগ্রেস এর বহুধাবিভক্ত সম্প্রদায়গত বর্ণহিন্দু শ্রেণীকে সচেতন করে তোলে।এরই মাঝে ১৯৩০ সালের দিকে পল্লী অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে বেশ গতি পায়।১৯৩৫ সালের সংস্কার আইনের ফলে ভারতীয় গ্রামীন ভোটাধিকারের ন্যায্যতা নিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক মন্দা বাঙালি জমিদার শ্রেণী কে বেশ কষ্টের মধ্যে ফেলে।হঠাৎ করেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে জমিদারদের প্রভাব অনেকটা ক্ষুন্ন হয় এবং অর্থলগ্নিকারী ও ঋণদাতা ব্যবসায়ীরাও চরম ক্ষতির মুখে পড়ে।অর্থলগ্নিকারী এবং দাদন ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ মহাজন ছিল হিন্দু। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে শহরমুখী বাবু শ্রেণীর রাজনীতীকে বের করে এনে পল্লী অঞ্চলে স্থান দেওয়া হয়।হঠাৎ করেই পল্লী অঞ্চলের এই উদ্ভব শহরমুখী বাবু শ্রেণীকে বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে।যার ফলে জাতীয়তাবাদী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বর্ণ শ্রেণীর কংগ্রেস তুমুলভাবে হোঁচট খাই।আইনসভায় অধিকাংশ আসন পল্লী এলাকায় নিয়ে পল্লী অঞ্চলকে রাজনীতিতে নতুন করে রাজনৈতিক খেলাঘরে প্রবেশ করানো হয়।যার ফলে বেঙ্গল কংগ্রেস অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পল্লি অঞ্চলের রাজনীতির উদ্ভব বাংলার বিখ্যাত অনেক রাজনীতিবিদ কে প্রথম সারির রাজনীতিতে এনে দেয়,এর ভিতরে ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।পল্লি অঞ্চলের রাজনীতি উদ্ভবের সাথে সাথেই পল্লী অঞ্চলের নিষ্পেষিত জনসাধারণ স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলে।লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে কতিপয় সদস্য কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করে নেয় এর ভিতরেই। পল্লী অঞ্চলের এই রাজনীতি ভারতীয় প্রেক্ষিতে বেঙ্গল মুসলিম লীগের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।কেননা, পূর্ববাংলার অঞ্চলগুলো ছিল পশ্চিমবাংলার হিন্দু জমিদারদের আয়ের প্রধান উৎস।রাজনীতি সচেতন পল্লীবাংলা অঞ্চলের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া কারণে কৃষক শ্রমিক পার্টি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।বাঙালি মুসলিম প্রজাদের দুঃখ-কষ্টের প্রেক্ষিতে জমিদারি উচ্ছেদ ই হয়ে ওঠে কৃষক প্রজা পার্টির একমাত্র লক্ষ্য।বেঙ্গল মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক মনোভাব এক্ষেত্রে কৃষক প্রজা পার্টি কে থামাতে পারে নি।বরং বাঙলার নিষ্পেষিত মুসলিম জনগণ থেকে শুরু করে তফসিলী হিন্দু সবাই কৃষক প্রজা পার্টি কে ভোট দিয়েছিল।এর পরের বছরগুলোতে কৃষক প্রজা পার্টি ও বেঙ্গল মুসলিম লীগ এর মধ্যে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বীতার সৃষ্টি হয়।১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কোয়ালিশন করে কৃষক প্রজা পার্টি ও বেঙ্গল কংগ্রেস রাজনৈতিকভাবে এক কাতারে আসে।নৈতিকভাবে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্তেও বেঙ্গল কংগ্রেস এবং কৃষক প্রজা পার্টি একই ব্যানারে আসে,মুসলীম লীগের প্রভাব ক্ষুন্ন করতে।তবে খুব বেশিদিন এই কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারেনি রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা করতে না পারায় কংগ্রেস ও কৃষক প্রজা পার্টি মধ্যকার সমঝোতা ভেঙে যায়।এর ফলে কংগ্রেস জোট থেকে বাহির হয়ে কৃষক প্রজা পার্টি মুসলিম লীগের সাথে জোট গঠনে বাধ্য হয়।বলাই বাহুল্য দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগটি খুঁজছিল মুসলিম লীগ।এই কোয়ালিশন স্বাভাবিকভাবেই আইনসভায় কংগ্রেস ও ভদ্রলোকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে থাকে।বাঙলার আইন সভা গঠনের পর হিন্দুদের স্বার্থের ওপর আক্রমণ মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকার দারুণভাবে বর্ণহিন্দুদের উপর প্রভাব বিস্তার শুরু করে।বেঙ্গল কংগ্রেসের রেডিক্যাল (সুভাষ বসু) ধারা বাংলা রাজনীতিতে প্রভাব রাখলেও তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গঠনে তেমন কার্যকরী কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।সুভাষ বসু ও শরৎ বোস এর নেতৃত্বে কংগ্রেসের এই ধারাটি ছিল বেঙ্গল কংগ্রেসের একটি সংখ্যালঘু অংশ।কংগ্রেসের রেডিক্যাল বা বাম ধারা মুসলিমদের সমস্যা নিরসনে জোর দিলেও জাতীয় কংগ্রেসের হাইকমান্ড বরাবরই ছিল ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষন ও সংশ্লিষ্টর জায়গা।বরাবরের মতো শরৎ বসু ও সুভাষ বসুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের এই ধারাটি মুসলিমদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস থেকে বহিস্কার করে।ফলে কংগ্রেস দল নিরপেক্ষ নীতির বাইরে হিন্দু ও চারিত্রিক দিক হতে রক্ষণশীল হয়ে পড়ে।ক্ষমতা সম্প্রসারণ যতই বাঙালি মুসলিম সমাজের দখলে যেতে থাকে ততই বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোক সচেতন হয়ে ওঠে নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে।যখন সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ও বহুমুখী চাপে বেঙ্গল কংগ্রেস দ্বিধাবিভক্ত তখনই উদ্ভব হয় হিন্দু স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিন্দু মহাসভার।হিন্দু মহাসভা ১৯৩৯ সালের ২৭ এপ্রিল ডিসেম্বরে আর্বিভাব হয়।জাতীয় কংগ্রেস তো বটেই বেঙ্গল কংগ্রেসের বামধারা এক্ষেত্রে হিন্দু মহাসভার কটাক্ষের শিকার হয়।সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে হিন্দু মহাসভা দেখতে থাকে হিন্দুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন কারী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর ফলে বহু হিন্দু কংগ্রেস ত্যাগ করে মহাসভায় যোগদান করে এবং মহাসভাকে নিজেদের বিপুল অর্থ দিয়ে সাহায্য করে তোলে।প্রথমদিকে কংগ্রেস হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে ভয় পায় তারা এই মনে করে যে এতে করে বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোক মহাসভাতে তুমুলভাবে যোগদান করলে কংগ্রেস তার বড় একটি শ্রেণীস্বার্থ হারাবে।কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।মহাসভার উত্থান নিঃসন্দেহে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী শক্তিকে খানিকটা হলেও সংরক্ষিত আসন থেকে বের করে আনে এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে ঠেলে দেয়।এক্ষেত্রে কংগ্রেস ঠিক সেই কাজটি করে যেটা হিন্দু মহাসভা ইতিমধ্যে করতে শুরু করেছে, তারা হিন্দু মহাসভার সংরক্ষিত বিষয়গুলিকে নিজেদের মধ্যে আত্তীকৃত করতে শুরু করে।কংগ্রেস মহাসভার হিন্দু স্বার্থকে ব্যবহার করে হিন্দু ভদ্রলোকের সহানুভূতিকে মহাসভা থেকে কংগ্রেসে ফিরিয়ে আনতে।বাঙলা ভাগের ক্ষেত্রে বাঙালিদের জাতীয় উপাদান শুধু যে ধর্ম নয় সেটি লেখক সুস্পষ্টভাবেই গ্রন্থের দেখিয়েছেন।সামাজিকতা, কুসংস্কার রীতিনীতি, সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রে ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলা ভাগের ক্ষেত্রে।সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে হিন্দু পন্ডিতগণ বিশেষ করে মুসলিম দেরকে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী এবং তাদেরকে শ্রেণীবৈষম্যের একটি পৃথক চেতনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।হিন্দু ভদ্রলোকদের কাছে ১৮৫৭ সালে পলাশীর পরাজয় ছিল একটি নতুন সম্ভবনা।ব্রিটিশ শাসন কে মুসলিম শাসন এর চাইতে অধিক কার্যকর এবং কল্যাণ কামনা হিসেবেই হিন্দু ভদ্রলোক কাছে পরিগণিত হয়ে ছিল।উপন্যাসের চরিত্র ও হিন্দুত্বভাব বাঙলার জাতীয়তাবাদী চরিত্রকে একপেশে নিয়ে যায়।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে বাঙালির হিন্দু আনা ভাব কে পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়।লেখক বিষয়টিকে এভাবে বলছেন”বাঙলা হলো হিন্দু ভদ্রলোকের সৃষ্টি।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে ‘আহৃত’ ‘দীপ্তি’র সাহায্যে তারা বাংলা কে পুনরায় ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। অধিকার বলে বাঙলা তাদেরই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নব জাগরণই হলো শুধু ভদ্রলোকের সংস্কৃতির প্রতীক নয়, সেই সঙ্গে একটি হিন্দু বাঙলার, যেখানে মুসলমানের ঠাঁই নেই।লেখক এর মতে ‘হিন্দুত্বে’র বৈশিষ্ট্য হিসেবে নবজাগরণ এবং সাধারণভাবে সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা হয়।সব মিলিয়ে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে হিন্দুদের ভোটব্যাঙ্ক কিছুটা হ্রাস পেলেও অবশেষ তফসিলী দের ভোট ব্যাংক এ নিয়ে আসতে হিন্দু বর্ণ শ্রেণী একমত হয়।বাঙলার জনসংখ্যার মধ্যে মোটামুটি ভাবে শতকরা ১১ শতাংশ তফসিলী সম্প্রদায়ের লোক ছিল।তাদেরকে ফলপ্রসূভাবে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা গেলে এবং হিন্দু হিসেবে আদমশুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করা গেলে প্রাদেশিক ক্ষমতায় উচ্চ শ্রেণীর স্বার্থ জোরদার হবে।১৯৩৭ সালে নির্বাচন এটা প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র ব্যাপক হিন্দু সমর্থন পেলেই দেশের রাজনীতিতে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে নতুবা তফসিলী সম্পদের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ এর বেশি আসন লাভে কংগ্রেস দলের সামাজিক সীমাবদ্ধতা এবং ভদ্রলোক জগতের ক্ষুদ্র গন্ডির বাইরে বন্ধু লাভের ব্যর্থতা প্রকাশ পায়।শুরু থেকেই কংগ্রেস যে উচ্চবর্ণ হিন্দু শ্রেণীর ভদ্রলোকের একটি সংগঠন ছিল ঠিক সেখান থেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ থেকে সরে এসে কংগ্রেসের নিজের স্বার্থকে সংরক্ষিত রাখতে তফসিলী ভোটব্যাংক ও নিম্ন শ্রেণীর হিন্দু দের কাছে টানতে শুরু করে।সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ এর বিধান নিয়ে প্রাদেশিক রাজনীতিতে ভদ্রলোকের কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ চলে গেলেও স্থানীয় জেলা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে কোন অসুবিধা হয়নি।বিশেষ করে পূজামণ্ডপে এবং মুসলমানদের আশুরাসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঝামেলা লেগেই থাকত।স্থানীয় পরিষদের কে কতটা ক্ষমতাবান এবং পূজামণ্ডপের সময় প্রতিমূর্তি মসজিদের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা, মসজিদের সামনে গানবাজনা কে কেন্দ্র করে সব সময়ই হিন্দু এবং মুসলিমদের মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করতো।ক্ষমতার ভারসাম্যের এই পালাবদল ধীরে ধীরে বাঙলা কে অবশ্যম্ভাবী ভাবে ভাগ এর রাজনীতীতে নিয়ে যাই।১৯৩৭সালে বিভিন্ন প্রদেশে দায়িত্ব গ্রহণের সময় কংগ্রেস হাইকমান্ড সরকার গঠনে কোয়ালিশন নীতি গ্রহণ অস্বীকার করে।

যেসব দল নির্বাচন করেছিল তারা ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে তাদের স্বতন্ত্র ভাবে কংগ্রেসের সাথে একতাবদ্ধভাবে কংগ্রেসে মিলে যেতে বলা হয়। কিন্তু কংগ্রেসের নির্বাচনী ওয়াদা ভঙ্গ করে বলে যে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারে যোগ দিতে চাইলে তাদের স্বতন্ত্র সংগঠন ত্যাগ করে কংগ্রেসে যোগ দিতে হবে।এতে বিস্ময় হওয়ার কিছুই নেই যে যুক্ত প্রদেশের মুসলিম লীগ ও জিন্নাহর কাছে এই শর্ত কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়নি।কেবিনেট মিশনে জিন্না প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সংহতি প্রকাশ করলেও শেষ পর্যায়ে নেহেরু সেটাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণার মাধ্যমে ভারতকে একটি ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্র থেকে সরে এসে হিন্দু এবং মুসলিম দুই ভাগে বিভক্ত করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন।১৯৪৫-৪৬ সালে সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের সাধারণ হিন্দু নির্বাচনী এলাকায় খুব ভালো ফলাফল করে ;কিন্তু ভারতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের দাবি প্রমাণে সে ব্যর্থ হয় যার ফলে কংগ্রেসকে জাতীয়তাবাদী সর্বভারতীয় সংগঠন এর মনোভাব থেকে সরে এসে তার পূর্বের সেই রক্ষণশীলতা নীতী মেনে নিতে হয়।১৯৪৬ সালের দাঙ্গার শ্রেণীবৈষম্যের ফাটল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের চিড় ধরায় যা ভারত ভাগকে তরান্বিত করে।১৯৪৬ সালে শেষ হবার আগে থেকেই বেঙ্গল পার্টিশন লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রয়াস চলতে থাকে যে বাংলার একটা অংশ হিন্দুদের স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ইন্ডিয়ান ডোমিনিয়নে যুক্ত হবে।সম্মিলিত আবেদনের জেলাভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ ও হিন্দু ধর্মের আনুপাতিক হার ১৯৪৭ এটাই প্রকাশ করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দিক থেকে হিন্দু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দিক থেকে মুসলিম দুইটা আলাদা প্রদেশ হিসেবে থাকতে চাই।অবিভক্ত বাংলাকে এক রাখা প্রসঙ্গে কংগ্রেসের হাইকমান্ড এবং মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটি কোন সহায়তা করেনি।গান্ধী এবং জিন্না প্রথমদিকে বাংলাকে অবিভক্ত রাখার পক্ষপাতী হলেও কংগ্রেসের হাইকমান্ড এবং ওয়ার্কিং কমিটি বাঙলাকে ভাঙ করার সিদ্ধান্ত হয়।৩জুন কংগ্রেস বিভক্ত বাংলা পরিকল্পনাটি গ্রহণ করে।সবশেষে শরৎ বসু, আবুল হাশিম ও শেরে বাংলা একে ফজলুল হক একটি প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন অবিভক্ত বাংলার জন্য কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে সর্বভারতীয় পর্যায়ের ভদ্রলোক থেকে শুরু করে সর্বমহলের হিন্দুসমাজ বাংলাকে ভাগ করার রায় দেশ।বাঙলা ভাগ হয়। সবমিলিয়ে”বাঙলা ভাগ হলো হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশবিভাগ” বইটিতে জয়া চ্যাটার্জি লেখক এবং গবেষক দেখাতে চেয়েছেন ঠিক কিভাবে বাংলা র মতন প্রদেশের জাতীয়তাবদী মানসিকতা থেকে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার পর্যায়ে নিয়ে আসতে সামাজিক,সাংস্কৃতিক রীতীনীতির উপাদানগুলা নির্ধারণ করে দিয়েছে সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ পথে ধর্ম রক্ষার ও স্বার্থের অভিসন্ধি গ্রহণ কে।