বামনায় নৌকায় ভোট না দেয়ায় সংখ্যালঘুকে লোহার পাইপ দিয়ে নির্মম নির্যাতন

গোলাম কিবরিয়া, বরগুনা।।
বরগুনার বামনা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকায় মার্কার চেয়ারম্যানকে ভোট না দেয়ায় এক দরিদ্র সংখ্যালঘু পরিবারসহ একাধিক পরিবারকে গ্রাম ছাড়ার হুমকি দিয়ে আসছেন। গ্রাম না ছাড়ায় পুলিশের উপস্থিতিতেই লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে নির্মম নির্যাতনও করলেন তিনি। একই সময়ে এ সংখ্যালঘুর আয়ের একমাত্র উৎস চায়ের দোকানটিও গুড়িয়ে দেন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা।

নির্যাতনের শিকার অসীম চন্দ্র শীল মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) সকালে সাংবাদিকদের কাছে এমনই বর্ননা দিলেন। নির্বাচন শেষ হতে না হতেই প্রতিপক্ষকে দমন খেলা শুরু করে দিয়েছেন বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম জোমাদ্দার।

নির্যাচনের শিকার অসীম চন্দ্র শীল জানান, বামনা উপজেলোর রামনা ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা তিনি। তিনি রাজধানী ঢাকার একটি সেলুনে নরসুন্দরের কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করেন। তার দরিদ্র পিতা শ্রী বিমল চন্দ্র শীল স্থানীয় বৈকালিন বাজারের একজন ক্ষুদ্র চায়ের দোকানী। করোনা মাহামারির কারনে বেশ কয়েক মাস ধরে নিজ গ্রামের বাড়ি চলে আসেন অসীম। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের বিজয়ী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম জোমাদ্দার ও তার ক্যাডার বাহিনী ভোট না দেয়ার অভিযোগ তুলে পরিবারকে গ্রাম ছাড়াসহ লোহার পাইপ দিয়ে নির্মম নির্যাতন করেন।

অসীম চন্দ্র শীল আরও জানান, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নেতা হওয়ায় এবং তার অসংখ্য ক্যাডার বাহিনী থাকায় ভীত হয়ে চলতি মাসের ১৭ জুলাই সন্ধ্যা সাতটার দিকে বৈকালিন বাজারে উপস্থিত হয়ে সকল ভুল ত্রুটির জন্যে ক্ষমা চাইতে মো. নজরুল ইসলাম জোমাদ্দারের কাছে দেখা করতে যান অসীম চন্দ্র শীল। এ সময় চেয়ারম্যানের ক্যাডার বাহিনীর সদস্য ফরিদ (৩৫), বাপ্পি (৪০), ফোরকান (২৬), ইমরান (১৭) এবং রাজু জোমাদ্দারসহ (৪০) আরও অনেক লোকজন মিলে অসীমকে ক্রিকেটের শক্ত স্টাম্ব দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয়। এসময় স্থানীয় প্রতিবেশী জহিরুল ইসলাম উজ্জল ও ফকরুল ইসলাম কমল তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাদেরকেও বেদম মারধর করে হাত ভেঙে দেয় তারা। এ ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে বামনা থানার এস আই সিদ্দিকুর রহমানকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন বামনা থানার ওসি মো. বশিরুল আলম।

পরে মাথায় রক্তাক্ত জখম নিয়ে অসীম চন্দ্র শীল পাশর্^বর্তী আরএন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে গেলে সেখান থেকে তাকে ধরে এনে চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম জোমাদ্দার নিজেই লোহার পাইপ দিয়ে পূণরায় নির্মম ও নৃশংসভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। এসময় এস আই সিদ্দিক এবং ওসি বশিরুল আলম ঘটনাস্থল থেকে অল্প কিছু দূরে উপস্থিত ছিলেন। এস আই সিদ্দিকের সামনে নির্মম এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অসীমকে রক্ষা করতে কোন উদ্যোগই নেননি তিনি। একই সময়ে বৈকালিন বাজারে অসীম চন্দ্র শীলের দরিদ্র পিতার দৈনন্দিন উপর্জনের একমাত্র অবলম্বন চায়ের দোকানটিও ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেন নজরুল ইসলাম জোমাদ্দার ও তার পোষা ক্যাডার বাহিনী। এসময় স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মালেক মেম্বার (৫০) নজরুল ইসলামকে থামাতে গেলে তাকেও লাঞ্ছিত করেন বলে জানান ভুক্তভোগী অসীম চন্দ্র শীল।

প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা মো. নজরুল ইসলাম জোমাদ্দারের ভয়ে বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎিসা নিতে পারেননি অসীম। এখন পর্যন্ত থানায় মামলা করতেও সাহস করেননি তারা। প্রথমে মঠবাড়িয়া হাসপাতালে এবং পরে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন অসীম চন্দ্র শীল।

এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার আরেক এলাকাবাসী জহিরুল ইসলাম উজ্জল বলেন, মারধরের সময় অসীমকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাকেও পিটিয়ে হাত ভেঙ্গে দেন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার ক্যাডার বাহিনী। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে যারা নজরুল ইসলামকে সমর্থন দেয়নি তাদেরকে নির্বাচনের পরে খেলা দেখাবেন বলেও নির্বাচন চলা কালিন সময়ে হুমকি দেয় তার ক্যাডার বাহিনী।

রামনা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম জোমাদ্দার সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এরকম কোন ঘটনাই ঘটেনি। বরং অসীম চন্দ্র শীল এবং তার সহযোগীরা তার লোকজনের উপর হামলা চালালে তা প্রতিহত করতে গিয়ে দুএকজন আহত হতে পারেন।

ঘটনাটি জানতে বামনা থানার এস আই সিদ্দিকুর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে বামনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বশিরুল আলম বলেন, এ বিষয়টি তিনি শুনেছেন ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেছেন। এ ঘটনায় কেহই থানায় মামলা করতে আসেননি,লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।