বিএ পাশ কৃষক আবুবকরের সংগ্রামী জীবনে সফলতার গল্প!

মামুন হোসেন, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর)।।
জীবনযুদ্ধে অনেক প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন, তবে কখনোই হেরে যাননি ভান্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের মাটিভাংগা গ্রামের মডেল কৃষক মো. আবুবকর ছিদ্দিক। কৃষিক্ষেত্রে অবদান রাখায় ২০১৭ সালে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি অন্য কৃষকদের থেকে আলাদা। পড়াশোনা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন বারবার। কিন্তু থেমে যাননি কখনও, সফলও হয়েছেন। আজ তিনি বিএ পাশ কৃষক। এলাকায় শিক্ষিত কৃষক হিসেবে পরিচিত আবুবকর। এলাকার বহু শিক্ষিত যুবক তার পরামর্শে এবং সহযোগিতায় কৃষি কাজে এগিয়ে এসেছেন।

জানা গেছে, আবুবকরের খামার পরিদর্শনে গিয়ে অভিভূত হয়ে পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তাসমিমা হোসেন তার বাড়ির ১০ বিঘা জমি বিনামূল্যে তাকে চাষাবাদ করতে দেন। ওই জমিতে এবছর (২০১৯ সালে) বারোমাসি তরমুজ চাষ করে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তরমুজ ছাড়াও প্রায় আড়াই লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে আগাম সবজি যেমন ফুলকপি, বাধাকপি, ছিম, করলা, শশা, লাউ, বরবটি, মুলা, ধুনিয়া পাতাসহ নানা ধরনের সবজি চাষ করেন। কিন্তু ঘুর্ণীঝড় বুল-বুল তার সবজি খামার তছনছ করে দেয়। নষ্ট হয়ে যায় লাখ লাখ টাকার সবজি। বর্তমানে তিনি পুনরায় আবার চাষাবাদ শুরু করেছেন। তার নিজের ট্রাক্টর অথবা পাওয়ার ট্রিলার না থাকায় তিনি নিজের হাতে লাঙল নিয়ে দিনভর কঠোর পরিশ্রম করে সবজির খামার তৈরী করছেন।

কৃষক আবুবকর ইতোপূর্বে তার নিজ বসত বাড়ির পার্শে¦ প্রায় দেড় একর জমিতে বাউকুল, করলা, আখসহ বিভিন্ন সবজি চাষে সফল হয়েছেন। ওই জমিতে এমনভাবে খামারটি সাজিয়েছেন যে বসত বাড়িটির তিন দিকে রয়েছে সবজী খামার, বাড়ির সামনে মিশ্র ফলদ বাগান, নালায় (বেড়) রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য চাষ। তাকে অনুসরণ করে প্রতিটি গ্রামে যদি এ ধরণের খামারে পরিণত হত তবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে। আবুবকর তার খামারে সারা বছর মৌসুমী শাক-সবজি চাষ করে থাকেন। এর মধ্যে করলা, বরবটি, পেপে, শসা, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, লাল শাখ, পালং শাখ, কাকরোল, মূলা, বাধাকপি, ওলকপি, মরিচসহ নানা সবজি।

আবু বকর বলেন, আমি যখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র তখন থেকে আমাকে সংসারের অনেক কাজ করতে হয়। এমনি করে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক স্তরে পদার্পন করি। আমার লেখা পড়ার খরচ যোগাতে বাবা-মার কষ্ট দেখে আমি মাঝে মাঝে অন্যের কাজ করে লেখা পড়ার খরচ জোগার করতাম। এমন সংকটের মধ্যে ১৯৯০ সনে এসএসসি পাশ করি। এরপর আমার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অর্থ্যাৎ আমার পরিবারের পক্ষে লেখা পড়া খরচ চালানো একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু আমার প্রতিজ্ঞা আমাকে যে করে হোক লেখা পড়া করতেই হবে। ইতিমধ্যে কলেজে ভর্তি হবার সময় শেষ হয়ে যায়। আমার সহপাঠীগণ সকলে কলেজে ভর্তি হয়। আমি শত চেষ্টা করেও ভর্তি হওয়ার টাকা যোগার করতে পারছিলাম না। তখন মনে মনে ভাবি আমার লেখাপড়া আর করা সম্ভব হচ্ছে না।

এমন সময় স্থানীয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তি সহায়তায় সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আমার অবস্থার কথা বলি। তিনি আমাকে ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হবার ব্যবস্থা করে দেন। মাঝে মাঝে অন্যের কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালাতাম। এমনি করে ১৯৯২ সনে এইচএসসি পাশ করি। এরপর যে কোন কারণে আমার বাড়িতে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক কষ্টে ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হই। দুঃখের বিষয় বন্ধুদের মত ক্লাস করা আর সম্ভব হল না, পাড়ি জমাই চট্টগ্রামে, সেখানে গিয়ে প্রথমে শ্রমিকের কাজ নেই, এক পর্যায় গার্মেস কারখানায় চাকুরি পাই। দিনে কাজ এবং রাত্রে লেখাপড়া এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, অভাবের কাছে হার মানা যাবে না। আমাকে বিএ পাস করতেই হবে, এমনি করে ১৯৯৪ সনে ডিগ্রি পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করি এবং আমি ২য় বিভাগ পেয়ে পাশ করি।

এর পরে ১৯৯৫ সনে গ্রামের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষক পদে আমার চাকুরি হয়। এরপর থেকে বাবার লন্ডভন্ড সংসারের হালধরি তখন আমার মাসিক বেতন ছিল ১৭৩৫ টাকা। এই সামান্য বেতন দিয়ে সংসার চালাতে আমি হিমশিম খাই এবং বাড়তি আয়ের পথ আমি খুজতে থাকি এবং কৃষি পেশাকে বাড়তি আয়ের উৎস হিসাবে গ্রহণ করি। এই পেশার মাধ্যমে অল্প দিনের মধ্যেই আমি বাড়তি আয়ের পথ খুজে পাই।

এরপর থেকে তিনি কৃষি নিয়ে ব্যাপকভাবে ভাবতে শুরু করেন। কিভাবে সারা বছর মৌসুম ভিত্তিক ফসল ফলানো যায়, অল্প দিনের মধ্যে ভান্ডারিয়া উপজেলায় মডেল কৃষক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন আববুকর। এতে কৃষির প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও ইলেকট্টনিক্স মিডিয়ায় কৃষিতে তার সফলতার কথা প্রচার করে। এমনিভাবে কৃষি থেকে উর্পাজনের মাধ্যমে তার সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের (ঘুর্ণিঝড় বুল বুল) কবলে পড়ে তিনি আবারও সর্বশান্ত হয়ে যান। তবে তিনি আশাহত হননি। তার বিশ্বাস তিনি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।

আবুবকর জানান, একেরপর এক ঘুর্ণিঝড় তার ফসলের ওপর তান্ডব চালায়। এবারের ঘুর্ণিঝড়ে তার সবজি খামার নষ্ট না হলে তিনি চলতি মৌসুমে সবজি বিক্রি করে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় করতেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আল-মামুন জানান, ঘুর্ণিঝড় বুল-বুলের আঘাতে আবু বকরের কৃষি খামারে ব্যপক ক্ষতি হয়েছে।