ভাণ্ডারিয়ায় ১২টি সুইসগেট এখন লক্ষাধীক মানুষের গলার কাঁটা

মামুন হোসেন, ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর)।।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ১২টি সুইসগেট এ অঞ্চলের লক্ষাধীক মানুষের এখন গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে। সুইসগেট গুলো যথাযথ কাজ না করায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও শুস্ক মৌসুমে পানি সংকটে চাষাবাদ ও মানুষের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যা কবলিত খালের দুই পারের কিছু অংশে ভাঙন রোদে অপরিকল্পিত ব্লগ ফেলা হয়েছে। এ কারনে খালের জল প্রবাহ কমে গেছে। এ কারনে বছরের পর বছর উক্ত খালে কচুরীপানার স্তুপ হয়ে পড়েছে ফলে নৌকা সহ সকল প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এই খালের পানি ব্যবহারকারী হাজার হাজার লোকজনকে অশেষ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়াও দীর্যদিন কচুরীপানার স্তুপ থাকায় ওই খালের পানি বিষক্ত হয়ে উঠছে। পানি ব্যবহার কারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে নানান রোগ বালাই। প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত গেট, অপরিকল্পিত ব্লগ ফেলে পানি প্রবাহ বন্ধ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে উপকারের পরিবর্তে এখন ৮ গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার চারদিকে ৩৯/২ সি পোল্ডারের বেষ্টিত বেড়িবাঁধে ছোট-বড় মিলিয়ে ১২টি বেষ্টিত রয়েছে। চাষাবাদের স্বার্থে ২০১৫ সালে নির্মিত ভুবনেশ্বর খাল, পোনা ও কঁচা নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলোকে সুইসগেট দিয়ে সুইসগেটের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত দরজা থাকায় পানিপ্রবাহের গতি কমে যায়। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য খাল এরই মধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। আর এসব জায়গা স্থানীয় প্রভাবশালীরা ঘরবাড়ি নির্মাণসহ মাছ চাষের নামে দখল করে নিচ্ছে। দু-একটি জলকপাট থেকে সামান্য পানি প্রবেশ করলেও তা খালের অপর প্রান্তে পৌঁছে না। এছাড়া, জলকপাট অচল থাকায় গেইটগুলো কৃষকের কোনো উপকারে আসছে না। পাউবোর নজরদারির অভাবে এ সুইসগেটগুলো বন্ধ প্রায়। চাষাবাদের স্বার্থে দ্রুত সুইসগেটগুলো ও খালের কচুরীপানার স্তুপ অপসরণ সহ যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন এসব অঞ্চলের কৃষকসহ এলাকাবাসী।

মঙ্গলবার (১৩ জুন) সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ভাণ্ডারিয়া পৌর শহরের ভুবনেশ্বর খালে পোদ্দার বাড়ী সংলগ্ন নির্মিত সুইসগেটটিতে গিয়ে দেখা গেছে, দুটি কপাটের একটি নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয়রা সেটি সুইসগেটর পিলারের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রেখেছে।

স্থানীয় এক এলাকাবাসী ক্ষোভ নিয়ে জানান, অপরিকল্পিত সুইসগেট নির্মানের কারনে নদীর পাড় ভেঙ্গে গেছে। ভুবনেশ্বর খালের সুইসগেট থেকে পানি খালে প্রবেশ করতে না পারায় উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য ভাণ্ডারিয়া, জামিরতলা ও পশ্চিম পৈকখালী, উত্তর পৈকখালী, চড়াইল, রাধানগর সহ ৮ গ্রামের লক্ষাধীন মানুষ বর্ষা ও শুকনো মৌসুমে গোসল, রান্না, ক্ষেত-খামারে পানি সরবরাহে চরম দুর্ভোগে পরতে হচ্ছে।

গৌরীপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাকির হোসেন হাওলাদার জানান, মানুষের কষ্টের লাঘব করতে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ কচুরীপানা পরিষ্কার করা উচিত। খালটি পরিষ্কার করা হলে এলাকার হাজার হাজার মানুষের জন্য নৌকা ট্রলার চলাচলে সুবিধা সহ এই খালের পানি ব্যবহার করতে পারতো। এছাড়াও এই খালের পানি দিয়ে আমরা ফসল ফলাই, ওজু গোসল, রান্না বান্না, কাপড় ধোয়া সহ গৃহস্থালীর সব কাজ সম্পন্ন করছি। কিন্তু খালে কচুরিপানা জমে পানি বিষক্ত হয়ে দূর্গন্দ চড়াচ্ছে। আমরা পানি ব্যবহার করতে পারছি না। পানি ব্যবহার করলে ঘাঁ চুলকায় ও নানা রোঘ দেখা দিচ্ছে।

উপজেলার কৃষক মো: আব্দুল হাই সহ একাধিক কৃষকের সাথে আলাপকালে জানাযায়, গৌরীপুর ইউনিয়নের ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষি কাজে নিয়োজিত এবং এ পেশায় কাজ করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হতো। ইউনিয়নের খালগুলো বেহাল দশায় পড়লে চলতি আমন মৌসুমে প্রথম পর্যায়ের বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার বীজতলার জন্য ধান ফেললেও পানি বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে ভাল ফলন হয়নি। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট দেখা দেওয়ার কারণে সঠিকভাবে চাষাবাদ করে রবিশস্য উৎপাদন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ তাঁদের।

তারা দাবি জানিয়ে আরো বলেন, “কচুরিপানা ও নাব্যতা সংকটের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তির শেষ নাই। এই সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দাবি করেন তারা। এটা এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি।

চড়াইল গ্রামের শাহীদা বেগম ও শহর বানু বলেন, এই খালের পানি ৮ গ্রামের মানুষ রান্না-বান্না সহ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করে থাকে কিন্তু “পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কচুরিপানা পচে পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ৮টি গ্রামে বেড়েছে মশা মাছির উপদ্রপ।

পৈকখালী বাজারের বাসিন্দা আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, ভুবনেশ্বর খালটি গত ১৯ সালের দিকে খনন করা হয়। খালটি প্রায় ৬ কিঃমিঃ দীর্ঘ ও ১১০ ফিট চওরা। খাল খননের পরে আজ প্রর্যন্ত কোন পরিষ্কার পরিছন্নের উদ্যোগ দেখা যায়নি “ বর্তমানে খালের পানি পচে গেছে। এ পানি কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারছি না। তাই পানির কষ্টে আছি। আমরা দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান চাই।” কচুরিপানা পচে পানি অপরিষ্কার হয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কায় রয়েছে এলাকার মানুষ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল-মামুন সাংবাদিকদের জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ উপজেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১০,২০০ হেক্টর এর অনুকূলে ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়। কিছু কিছু বীজতলা সুইসগেটের অব্যবস্থাপনায় পানির অভাবে সমস্যা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধান না হলে অনেক এলাকায় রবিশস্য উৎপাদন সহ অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে আজ প্রর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা তা জানতে ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিমা রানী ধর ও অধিকাংশ ভুক্তভোগী এলাকা গৌরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো: মজিবুর রহমান চৌধুরীর সেল ফোনে বারবার কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী কৃষ্ণপদ দাশ মুঠোফোনে জানান, আমি পিরোজপুরে নতুন যোগদান করেছি। তবে, ভাণ্ডারিয়ায় গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সমস্যা সমাধানের দ্রুত চেষ্টা করা হবে।