‘মন্দ’ মেয়ে ‘মন্দ’ ছেলের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক

অনলাইন ডেস্ক।।
সারা দেশে পর্নোগ্রাফি দেখার হার বেড়েছে। ফলে সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। ‘বাংলাদেশে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজ বিস্তার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নারীর প্রতি সহিংসতা কর্মসূচির আওতায় বেসরকারি সংস্থা ডি-নেট দেশব্যাপী এই গবেষণাটি পরিচালনা করে। ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন পর্নোগ্রাফি দেখার হার বাড়ায় বাড়ছে নারীর প্রতি এই সহিংসতা।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা নায়িকাদের মতো যৌন আবেদনময়ী আচরণ অথবা পশ্চিমা সংস্কৃতির পোশাক পরে ও আচরণ করে বা টিকটক, লাইকি ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে অনলাইনে ও সামাজিকমাধ্যমে প্রচার করে, তারা ‘মন্দ’ মেয়ের তকমা পেয়েছে। অন্যদিকে যারা ধর্মীয় নিয়ম মানে, তারা ভালো মেয়ে, এটা মনে করেন শতকরা ৬৬ জন।

ধর্ষণের শিকার বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় যে মেয়ে ও নারী, এতে তাদের নিজেদেরও দোষ আছে, এমনটা মনে করেন শতকরা ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা। শতকরা ৭৩ জন মনে করেন যে, একটি মেয়ের জীবন তখনই সফল হয়, যখন একটি উপযুক্ত ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শতকরা ৬৩ জন মনে করেন, মেয়েদের বেশি স্বাধীনতা দিলে তারা পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে এবং শতকরা ৫৮ জন মনে করেন, মেয়েরা প্রায়ই ছেলেদের নির্দোষ আচরণকেও নির্যাতন মনে করে।

বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজনে গবেষণার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন ডি-নেটের ইনোভেশন অ্যাডভাইজার সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি পর্নোগ্রাফি দেখার হারও বেড়েছে। তিনি বলেন, গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, শতকরা ৭৪ জন উত্তরদাতা মনে করেন, ‘মন্দ’ মেয়ে, ‘মন্দ’ ছেলের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। আর সমাজে ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ মেয়ে আছে এমনটা বিশ্বাস করেন শতকরা ৭৯ জন উত্তরদাতা।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্দ মেয়ের মতো আচরণ সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত, কারণ তা অন্য ছেলেমেয়েদের নষ্ট করে ফেলতে পারে। এমনটি মনে করেন শতকরা ৭৯ জন উত্তরদাতা। তাই অনলাইনে মন্দ মেয়ের মতো আচরণ যারা করে, তাদের সেটা থেকে বিরত রাখার জন্য হেয় করা, মন্দ বলা ও তাদের প্রতি অপমানজনক আচরণ করা সমাজের জন্য উপকারী বলে মনে করেন শতকরা ৪৪ জন উত্তরদাতা।

গত বছর ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, আটটি বিভাগের ১৬টি জেলায় ৫১৮ জন ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে নারী ও পুরুষের সংখ্যা ছিল সমান সমান।

শতকরা ৮১ জন উত্তরদাতা মনে করেন, মেয়েরা খোলামেলা পোশাক পরলে, অশালীন আচরণ করলে, খারাপ ভাষা ব্যবহার করলে, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও মেলামেশা করলে, সেই মেয়েদের নানাভাবে হেয় ও তাদের প্রতি অপমানজনক আচরণ করা যায়। এর মধ্যে শতকরা ৩৯ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, মেয়েদের ভালো হতে উত্সাহী করা ও মন্দ বিষয়ে বাধা দেওয়া ও তাদের নিরাপদে রাখা পুরুষের দায়িত্ব এটা মনে করেন শতকরা ৮০ ভাগ উত্তরদাতা। এর মধ্যে নারী উত্তরদাতা ছিলেন ৩৫ শতাংশ।

শতকরা ৫২ জন মানুষ মনে করেন, মেয়েদের গণমাধ্যম, চলচ্চিত্রে কাজ করা, পুরুষের সঙ্গে রাতের শিফটে কাজ করা বা পুরুষের সঙ্গে দূরে কোথাও ভ্রমণ বা কাজে যাওয়া ঠিক নয়। এমন ধারণা পোষণকারীদের শতকরা ২১ জন নারী ও ৩১ জন পুরুষ এবং উত্তরদাতাদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি।

ডি-নেটের ইনোভেশন অ্যাডভাইজার সিরাজুল ইসলাম বলেন, পর্নোগ্রাফি দেখার হার বাড়ার ফলে সমাজে মেয়েদের প্রতি সহিংসতাও বেড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরদাতাদের ৮২ ভাগ মানুষই বলেছেন, তারা মনে করেন সহিংসতা বেড়েছে। নারীর প্রতি অবমাননাকর আধেয় কিশোর, যুবক ও পুরুষ নিয়মিত দেখে বলে গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৮১ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন। অনুষ্ঠানে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ করেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন শিক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারীকে সম্মান করা, মূল্যবোধের বিষয়টি শিশুকে পরিবার থেকেই শেখাতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেন, পর্নোগ্রাফি দেখে কেউ সহিংসতা করেছে তা আইনের মাধ্যমে প্রমাণ করা কঠিন। স্বামী পর্নোগ্রাফি দেখে স্ত্রীকে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ করলেও তা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

সাইকোলজিক্যাল হেলথ অ্যান্ড ওয়েলনেস ক্লিনিকের সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলর রেহনুমা ই জান্নাত বলেন, পর্নোগ্রাফি দেখে মানুষ এমনকি শিশুরাও অন্যদের সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করতে চায়। মূল্যবোধের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ইত্যাদি বিষয়েও জীবনের প্রতিটি ধাপে গুরুত্ব দিতে হবে।