মুলাদীর গ্রামীণ মেঠো পথ সুগন্ধি ছড়ানো কদম ফুল বিলুপ্তির পথে

ভূঁইয়া কামাল মুলাদী (বরিশাল)।।
বরিশালের মুলাদী উপজেলার গ্রামীণপথ সাজিয়ে রাখা কদম ফুল এখন আর তেমন দেখা যায় না। আগে গ্রামীণপথ দিয়ে চললেই চোখ কেড়ে নিতো পথের পাশে ফোঁটা হলুদ আর সাদা রঙের থোকা থোকা কদম ফুল।

ফুলগুলো চোখ ধাঁধিয়ে পথচারীদের দৃষ্টি কেড়ে নিত।পথের ধারে কদম ফুলের সৌন্দর্য দেখে মনটাও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত পথচারীদের। তাই বাড়ীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সামনের সড়কগুতো লাগানো হতো কদম গাছ। গ্রামীণ মেঠোপথ সুগন্ধি ছড়ানো কদম ফুল আজ বিলুপ্তির পথে। মুলাদী পৌর সদর গোডাউন রোড জয়ন্তি নদীর তীরে কদম গাছটির ফুলের সুগন্ধিতে মাতয়ারা করে রাখে ব্যবসায়ীসহ পথচারীদের। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। ক্ষণিকের জন্য হলেও কদম ফুলের সুগন্ধিতে পথিকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয় গাছটির দিকে।

এই তো কিছুদিন আগেও সোনালী রোদমাখা সকালে আলো ঝলমলে সূর্যের মিষ্টি তাপ চোখে পড়তেই ভেঙে যেত প্রশান্তির ঘুম। প্রকৃতির এমন অসহ্য রসিকতায় আজ বাদ সেধেছে বৃষ্টি। ঝুমঝুম নূপুরের শব্দে এখন যেন আর ঘুম ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। এই তো এসে গেছে অনির্দেশ্য বর্ষাকাল।

বিরহ-আলস্যের বর্ষা বছর ঘুরে আবার এসেছে তার নিজস্ব ভঙ্গিতেই, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে তার প্রিয় সৌন্দর্য কদম ফুলকে। গ্রীষ্মের প্রখরতা কমাতে যখন আম, কাঁঠালের ঘ্রাণে মুখর চারপাশ, ঠিক সে সময় আষাঢ়ে বাদলের দিনে আগমন ঘটেছে হৃদ্মোহিনী কদম ফুলের। তাই তো বৃষ্টির অবিরাম বর্ষণের সঙ্গে সহসাই ভেসে আসে কদম ফুলের রেণুর মিষ্টি সুবাস। কদম আর বর্ষা একে অপরকে আলিঙ্গন করে রয়েছে বহুকাল ধরে। এ জন্য কদম ফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত।

রূপসী তরুর অন্যতম রূপবতী হলো কদম ফুল। গাছে গাছে সবুজ পাতার ডালে গোলাকার মাংসল পুষ্পাধার আর তার থেকে বের হওয়া সরু হলুদ পাপড়ির মুখে সাদা অংশ কদমকে সাজিয়ে তুলেছে ভিন্নভাবে। গোলাকার হলদে-সাদা মিশ্রিত ফুলটি দেখতে যেন ভোরের উষা। বর্ষার মেঘের সঙ্গে মিতালি বলেই কি না, এর আরেক নাম মেঘাগমপ্রিয়। আর নারীর সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করে অনেকেই বলে ললনাপ্রিয়। এ ছাড়া সুরভি, প্রাবৃষ্য, বৃত্তপুষ্প, সিন্ধুপুষ্প, কর্ণপূরক, ভৃঙ্গবল্লভ, মঞ্জুকেশিনী প্রভৃতি নামেও কদমের পরিচিতি আছে। এত এত ভিন্নতার ছোঁয়াতে কদম হয়ে উঠেছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য।

গোলাপ, জবা, বকুল, কৃষ্ণচূড়ার মতোই কদম ফুল মিশে আছে বাঙালির মননে, ভাব ভাবনার অন্তরিক্ষে হয়ে উঠেছে সাহিত্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। কদম তলায় অচেনা পথিকের বাঁশির সুরে উতলা রমণীর আকুলতা নিয়ে লিখা পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের গান আজও গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে সিক্ত কোনো বিকেলে তিনটে কদম ফুল হাতে প্রেমিকের অপেক্ষার গল্পগুলো তো চিরায়ত। সেই গল্পে গোধূলিরাঙা আলোয় মন-মহুয়ায় আনন্দের সুর বাজায় অনুগামী কাদম্বিনী। বাতাসে দোল খাওয়া স্নিগ্ধ সতেজ কদম ফুলের তালে তালে পাখিরাও নেচে হয় পাগলপারা।

কদম ছাড়া বর্ষা যেন একেবারেই বেমানান। প্রাচীরের ধারে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কদম গাছগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় বর্ষা তার সবটুকু ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে মোটেই কার্পণ্য করে না।

বর্ষা এলেই কদম গাছের শাখায়, পাতার আড়ালে ফুটে থাকা অজস্র কদম ফুলের সুগন্ধ লোকালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই তো কদম ফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত।

প্রাণ সখীরে-ওই শোন কদম্ব ডালে বংশী বাজায় কে? আর রবী ঠাকুরের এ গান কে না জানে। বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান॥

বর্ষা নিয়ে কবি, সাহিত্যিক, গায়কদের উৎসাহের কমতি নেই। আর এ রূপসী বাংলা ছাড়া বিশ্বের কোথাও বর্ষার এ স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক রূপ চোখে পড়ে না।

কদম এমনই একটা ফুল চোখে পড়লে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া না করলে মন ভরে না। প্রস্ফুটন মৌসুমে ছোট ছোট ডালের আগায় একক কলি আসে গোল হয়ে। ফুল বেশ কোমল ও সুগন্ধী। একটি পূর্ণ মঞ্জরিকে সাধারণত একটি ফুল বলেই মনে হয়। কিন্তু বলের মতো গোলাকার মাংসল পুষ্পাধারে অজস্র সরু সরু ফুলের বিকীর্ণ বিন্যাস অতি চমৎকার। মঞ্জরির রঙ সাদা হলুদ মেশানো। সব মিলিয়ে সোনার বলের মতো ঝলমলে। বৃতি সাদা, দল হলুদ, পরাগচক্র সাদা এবং বাইরের দিকে মুখ। ফুলের পাঁপড়ির নিপুন বিন্যাস দেখে অনেক চুল প্রেমী ‘কদম ছাট’ দিয়ে থাকেন।