স্বজনহারাদের আর্তনাত, দ্বিতীয় দিনেও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ

গোলাম কিবরিয়া, বরগুনা।।
পুরো দক্ষিন অঞ্চলের নৌ-জনপথ স্তব্দ। মা-বাবা হারিয়েছে আদারের সন্তান, স্ত্রী হারিয়েছে স্বামী আর সন্তান হারিয়েছে বাবা-মা। কেউ কেউ তাদের পরিবার তাদের একমাত্র অপার্জনকারীকে হারিয়ে শোকবিহল। কেউ পেয়েছে গন্ধ পোড়া লাশ, অনেকে পায়নি তাও। অশ্রুজ্বলে কেহ পথ চেয়ে আছেন প্রিয় স্বজনদের খবর পেতে। সমাজের ব্যক্তিত্বকারীরা ( পরিচয়ের মানুষগুলো) আজ ( পরিচয়হীন) অজ্ঞত পরিচয়ে শুয়ে আছেন। নিখোঁজ থাকা মানুষগুলোর জন্য জীবিত আশা ছেড়ে দিয়ে লাশের দাবীতে স্বজনরা।

পরিবার, বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, স্বজন সবই ছিলেন। তাদের উপর পরিবারের নির্ভরতাও ছিলো, অথচ দুইদিন আগেও যাদের নাম ছিল। আজ সেই মানুষগুলোর পরিচয় এখন অজ্ঞাত লাশ।

ঢাকা-বরগুনা নৌরুটে বরগুনাগামী ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ৪২ জন নিহত, দগ্ধ আহত শতাধিক। যারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়াও নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক।

একান্ত আলাপনের সময় প্রতক্ষদর্শী আবুল বাশার জানান, রাত তখন পৌনে তিনটা, নিচতলার টিকিট কাউন্টার টেবিলের পার্শ্বে আমি ঘুমের তন্দ্রায় শুয়ে আছি। এসময় তিন-চারজন লোক চিৎকার করে বলতে লাগলো ইঞ্জিনঘরে আগুন আগুন, তখন আমি লাফিয়ে উঠে দেখি আসলেই আগুন জ্বলছে। পুরো লঞ্চে আত্মচিৎকার আর হুরাহুরি শুরু হলো। প্রথমে নদীর একপারে লঞ্চটি গেলে প্রায় দুইশতাধিক লোক লাফিয়ে লাফিয়ে পড়লেন।এরপর লঞ্চটি আস্তে আস্তে নদীর মাঝে চলে গেলো তখন আরো কান্নাকাটি বাড়তে থাকে এভাবে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট ধরে চলে আগুনের কান্ড। সর্বশেষ একটি চরে লাফিয়ে পরে জীবনে বাঁচিয়েছি।

কতজন মানুষ আগুনে পুড়ে মারা যেতে পারে এমনটা জানতে চাইলে তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, আমার মনে হয় দ্বোতলা,তিনতলার কেবিনের প্রায় মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। কারন এসব কেবিনের তলার দরজাগুলো তালা দেয়া ছিলো।

জানা যায়, ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক ৩ টায় ঢাকা-বরগুনাগামী লঞ্চ এমভি অভিযান-১০ এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়। ঘটনা ঘটে। এতে ৪২ জন নিহত হয়। তাদের মধ্যে বরগুনায় ৩৭ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। শুক্রবার বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান ঝালকাঠি থেকে পোড়া লাশ গ্রহন করে নিয়ে আসলে তারমধ্যে ১৪ টি লাশ সনাক্ত হলে তাদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করেন। বাকি ২৩ টি বেওয়ারিশ লাশ বরগুনার পোটকাখালী সরকারী গণকবরে দাফন।

স্বজনদের দ্বিতীয় দিনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ :
ঢাকা-বরগুনা রুটের এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকান্ডে নিহত দাবিদার ১২ স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য দ্বিতীয় দিনেও নমুনা সংগ্রহ হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় বরগুনা সদর জেনারেল হাসপাতালে ঢাকা থেকে আসা সিআইডির ৪ সদস্যের ফরেনসিক দল এ নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

এর আগে গতকাল সোমবার বিকাল চারটায় দিকে বরগুনায় সদর হাসপাতালে ৩৫ স্বজনদের নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হলে ২৩ জন নিখোঁজ বেক্তির পক্ষে ২৭ জন নমুনা দেন। বাকি ১২ স্বজনদের নমুনা হয়েছে ।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর অতিরিক্ত আইজিপির নির্দেশে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তাজুল ইসলাম এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

পরিচয়ের মানুষগুলো আজ অজ্ঞাত, লাশের দাবীতে স্বজনদের আর্তনাত :
অভিযান-১০ লঞ্চের অগ্নিকান্ডের আগুনে নিহতদের সাধারণ ডায়েরি নং-১০৯২/২৬। পরিচয়-অজ্ঞাত। প্রতিটা কবরের উপর এ কথাটি লেখা রয়েছে ।

পরিচয়ের মানুষগুলো এমন পরিচয় নিয়ে বরগুনার পোটকাখালী কবরস্থানের চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চ অগ্নিকাণ্ডের আগুনে মারা যাওয়া ২৩ জন। পোড়া লঞ্চের ধ্বংসস্তূপ উদ্ধার করা হয়েছিল তাদের পুড়ে অঙ্গার হওয়া মৃতদেহ। পুড়ে বিকৃত হওয়া নিথর দেহগুলোকে চেনার কোন উপায় ছিল না। তাই সবাই অজ্ঞাত পরিচয় নিয়ে পোটকাখালী কবরস্থানে শুয়ে আছেন।

বরগুনা জেলা প্রশাসন লঞ্চ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হওয়া ৩৭ জনের মরদেহ বুঝে নেয়। ১৪ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া বাকি ২৩ জনের মরদেহ অজ্ঞাত পরিচয়ে দাফন করা হয়।
শনিবার বেলা ১১ টার দিকে ৩০ জনের মরদেহ জানাজার জন্য নেয়া হয় বরগুনার সার্কিট হাউস মাঠে। জানাজা শেষে মরদেহগুলো আবারও স্বজনদের দেখানো হয়। এসময় ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়। এর আগে ৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তন্তর করা হয়। বাকী ২৩ জনের লাশ গণকবরে দাফন করেন।

এদিকে এখনো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ছোটাছুটি করছেন অনেকে। নিহতের স্বজনেরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনায় আর যেন কারো মৃত্যু না হয় । এর মধ্যে একটি কফিনের গায়ে লেখা ‘মা ও মেয়ের লাশ’। আগুনে পুড়ে অঙ্গার মা ও মেয়ের মরদেহ দাফনও করা হয়েছে একই কবরে। এই কবরের নামের বদলে দেওয়া হয়েছে অজ্ঞাত। মা মেয়ের নম্বর হচ্ছে মা ১০৯২/২৬ মেয়ে ১০৯২/৩৬।

সুমন বলেন, এখনো আমার দুই মেয়ে মেয়ে সুরাইয়া আক্তার মিম ও সুবনা আক্তার তানিসা, স্ত্রী তালসিমা এবং আমার শ্যালক জনির ছেলে জুনায়েদ ইসলামকে খুঁজে পাইনি। তাই এই গণকবরস্থানে এসেছি এখানে প্রতিটি কবরেই লেখা রয়েছে অজ্ঞাত কিন্তু নাম নেই। এখানেই মনে হয় আমার দুই মেয়ে স্ত্রী ও শ্যালকের ছেলে রয়েছে। তাই জেলা প্রশাসরে কাছে আবেদন করেছি। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য।

তিনি আরও বলেন, বেঁচে থাকার আশা তো শেষ এখন লাশ কয়টা পেলেই হয়। তবুও শান্তি পাব।
বরগুনা জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে আঙ্গার হওয়া ২৩ জনকে অজ্ঞাত পরিচয়ে দাফন করা হয়েছে । বাকি ১৪ জনকে তাদেরে পরিবারের কাছে হস্তন্তর করা হয়। অজ্ঞাতদের পরিচয় শুধুই নম্বর দেওয়া হয়েছে। এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছে তাদের পাওয়া সব ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে কারণ তারা জীবিত বা মৃত্য থাকতে পারেন।

এছাড়াও পরিবারের কাছে হস্তন্তর ১৪ জনকে দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে- বলে জানান তিনি ।