আগৈলঝাড়ায় জমির বিকল্প ধাপে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী কৃষক

মারুফ মোল্লা, আগৈলঝাড়া।।
দেশের শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত বরিশালের আগৈলঝাড়ায়ও করা হয়েছিল ভাসমান (ধাপ) বেডে সবজি চাষ। চাষিদের তৈরি করা ধাপে বোনা হয় লালশাক, পুঁইশাক, ডাটা, মরিচ, করলা, ঢেঁড়শ, হলুদ, শশা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, আলু অন্যতম। এছাড়াও ওই ধাপে করলা, বরবটি, সিম, পেঁপে, লাউ, কুমড়া, মরিচ, বেগুনসহ নানা জাতের সবজির চারাও উৎপাদন করা হয়। এভাবে ভাসমান বেডে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রায় ৪ শতাধিক পরিবার। জলাবদ্ধ এলাকায় বেড (ধাপে) সবজির চাষ করে এলাকায় সবজির চাহিদা মিটিয়ে বাহিরের জেলা বিক্রয় করা হয়। স্বল্প সময়ে এই প্রকল্পে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় এলাকার চাষীদের উৎসাহিত করে উপজেলায় এই চাষের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগ।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বেশীরভাগ জমিতে পানি নিস্কাশনের সু-ব্যবস্থা না থাকায় বছরের ছয় মাস এ অঞ্চলের জমিতে পানি জমা থাকে। এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য এই জলাবদ্ধতা কষ্টদায়ক। কারন, বছরে একবারই তারা জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন। বাকি সময় পানি জমে থাকার কারণে জমি থাকে অনাবাদি। বদ্ধ পানিতে আগাছা ও কচুরীপানায় ভরে যায় জমি। সরকার চাষিদের আত্মকর্মসংস্থান ও পরিবারের আয়ের সুযোগ করে দিতে ২০১৩ সাল থেকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধিনে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্টের অর্থায়নে “বন্যা ও জলাবদ্ধ প্রবন এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন অতিযোজন কৌশল হিসেবে ভাসমান সবজি ও মসলা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রারণ প্রকল্প” গ্রহণ করেন। ওই প্রকল্পের আওতায় রাজিহার ইউনিয়নের বাশাইল গ্রামে চাষী সমন্বয়ে একটি সমিতির মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বিনা মূল্যে বীজ সরবরাহ, বেড তৈরীর খরচ ও বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। কয়েক বছর আগে থেকেই বাশাইল গ্রামের চাষিরা বেড বা ধাপে সবজি উৎপাদন করে আসছিলেন। সরকারী সহায়তা পাবার পরে তাদের সাথে অন্য এলাকার চাষিদেরও বেডে সবজি ও মসলা চাষে আগ্রহ বেড়েছে।

উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের গোয়াইল গ্রামের মিরাজ বিশ্বাস, মোকসেদ বিশ্বাস, সিরাজ, বেল্লাল হোসেন, তোফাজ্জেল হোসেন, খালেক সরদার, বাশাইল গ্রামের চাষী তোফাজ্জেল হোসেন ও খালেক সরদার সাংবাদিকদের জানান, নিজস্ব প্রযুক্তিতে ধাপের উপর সবজি উৎপাদন শুরু করে। বাশাইল প্রামে ৭০ হেক্টর বেডে সবজি ও মসলা চাষ হচ্ছে। উপজেলার প্রায় ৬শ হেক্টর বেড এ সবজি ও মসলা চাষের লমাত্রায় নির্ধারন করা হচ্ছে। জমির বিকল্প হিসেবে মাঠের আগাছা ও খাল বিলের কচুরীপানা ব্যবহার করে বেড বা ধাপ বানিয়ে ফসল উৎপাদন করতে প্রথম পর্যায়ে তাদের এই কাজকে অনেকেই ভাল চোখে না দেখলেও পরে স্বল্প সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের কারণে এলাকার অনেকেই এখন ধাপের উপর সবজি চাষ করছেন।

তারা বলেন, জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা চাষের কার্যক্রম শুরু করা হয়। চাষীরা এসময় বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কচুরিপানার বড় বড় দলকে একত্রিত করে রাখেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তাতে পঁচন ধরে। পঁচন ধরা কচুরিপানাই ধাপ হয়।

প্রতিটি ধাপেই পর্যাপ্ত জৈবসারের কারণে সবজির চারাগুলো অত্যন্ত উর্বর হয়। প্রথমবার একমাস পরিচর্যার পর চারাগুলো বিক্রি করলেও পরবর্তীতে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই পুনরায় চারা বিক্রি করা যায়। সবজির চারাগুলো গ্রাম থেকেই পাইকাররা এসে মাদারীপুর, ফরিদপুর, চাঁদপুর, স্বরূপকাঠি, মাগুরা, হাটবাজারের বিক্রি করা হয়।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, ধাপের উপর সবজি চাষীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পর তাদের বিনা মূল্যে বীজ, সারসহ বিভিন্ন উপকরন দেয়া হয়। উপজেলার বাশাইলে ২৫ জন চাষীদের এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তারা সবাই বেডে চারা উৎপাদন করে বর্তমানে ভালো আয় আসে। ২৫ জনের বাহিরে অনেকে নিজ উদ্যোগে বেডে চারা উৎপাদন করছে।