আমার ক্যাম্পাস, আমার স্মৃতি

মিজানুর রহমান কাব্য।।
ক্যাম্পাস মানেই হলো ক্লাস, পরিক্ষা, এসাইনমেন্ট আর বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মত্ত হয়ে আনন্দময় মূহুর্তে ডুবে থাকা।
ল্যাম পোস্টের আলোয়ে সবুজ ঘাসে হেঁটে সন্ধ্যা পার করার অনন্যসুলভ লগ্ন।
সোনা ঝরা রোদ্দুরে কিছু টা পথ হেঁটে করিডোরে প্রবেশ করা কিংবা একটু প্রশান্তির জন্য ক্যাম্পাসের এক চত্বর থেকে অন্য চত্বরে প্রস্থান।
আবার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গোটা বিশ্ব নিয়ে কথার আসর জমিয়ে দেওয়া।
খোলা হাওয়ায় প্রকৃতির প্রতিটি অনন্য সাধারণ দৃশ্য নিজের অন্তর্লোকে স্থান দেওয়া।

চাঁদ মাখা রাতে গানের আসরে মাতিয়ে তোলা সেই প্রীতিলতা চত্বরে নিদ্রা হীন সেই রাত্রি যাপন।
রাতের মাধুরি মিশ্রিত, অসাধারণ সৌন্দর্য এবং মনোমুগ্ধকরা ক্যাম্পাসে হাঁটা সেই দলবদ্ধ সুহৃদ-বন্ধু মহল।
বলছি কীর্তনখোলা নদীর গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা , কীর্তনখোলা নদীর তীরে, কীর্তনখোলা নদীর প্রাণ, দক্ষিণ বঙ্গের বাতিঘর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা।

মহামারী (কভিড-১৯) এর প্রাদুর্ভাবে স্নিগ্ধতায় পূর্ণ, স্বর্গ খন্ড অঙ্গন টি প্রায় ১৫৬দিন বন্ধ।
প্রভাতের রাঙ্গা আলো ভোর গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে গোধূলী লগ্ন। তারপর মিশে যায় আঁধারে।
কিন্তু সেখানে রয়েছে হাহাকার, রয়েছে বিষণ্নতার প্রতিচ্ছবি। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ক্যাম্পাস যখন শিক্ষার্থী হীন হয়ে পড়ে,তখন বিষণ্ণতা, হাহাকার তাকে ঘিরে ফেলে।।শুধু ক্যাম্পাস হাহাকার, বিষন্নতায় ভুগছে, বিষয় টা এমন নয়। রঙ্গিন আলোয়ে ভরা দীপ্তিময় ক্যাম্পাসের প্রতিটি শিক্ষার্থীই ভুগছে এই যন্ত্রণার তীব্র অসহনীয় দাবানলে।

এখন আর তালতলায় গিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা কিংবা নজরুল গীতা পরিশীলন করা হয় না।।
হয়ে ওঠে না প্রানের স্পন্দনে স্পন্দিত জীবনানন্দ চত্ত্বরে গিয়ে প্রকৃতির রূপ-সুধা পান করা।
ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি যেন নীরব, নিস্তব্ধতার নিদর্শন এবং গুমোট হয়ে বসে আছে প্রতীক্ষার কল্পে।
সামিম মামার দোকানে গিয়ে এখন আর বলা হয় না যে,মামা চায়ে আদা দিয়ে একটা কড়া দুধ চা দেন,সাথে একটা গরম রুটি।
ভিসি গেঁটে গিয়ে এখন আর বলা হয় না যে মামা, কড়া ঝাল দিয়ে ঝালমুড়ি বানিয়ে দেন।
এসব এখন সপ্নের মত লাগে।

এখন আর কাউকে সারপ্রাইজ দিতে তার জন্মদিনে তার অজান্তে কেক নিয়ে উপস্থিত হয়ে এক সাথে মিলে মিশে বলা হয় না যে,শুভ জন্মদিন বন্ধু।

কিংবা কেক মাখিয়ে দেওয়ার জন্য অর্ধ ক্যাম্পাস দৌড়াদৌড়িও করা হয় না।।
স্বপ্নের সেই দোতলা লাল বাসে সামনের দিকের সিটে গিয়ে বসে গল্পের ছলে যাওয়া হয় না বঙ্গবন্ধু উদ্যান,প্লানেট পার্ক নিউ মার্কেট,লঞ্চঘাট, টিউশন কিংবা কোন সামাজিক কর্মকান্ডে।
ভালো লাগার এই মূহুর্ত গুলো বোধহয় এমন’ই প্রখর হয়।
পরম সুখের এই স্মৃতি গুলো অন্তরতম প্রদেশে যন্ত্রণার প্রজ্বলন ঘটায়।

ক্যাম্পাসের শোভামণ্ডিত করার নেপথ্যে অন্যতম সহায়ক হলো কৃষ্ণ চূড়া গাছ। কিন্তু আগের মত কৃষ্ণ চূড়া গাছের নিচে প্রাকৃতিক কার্পেটে বসে এখন আর গাওয়া হয় না সেই নন্দিত কথামালা।
“আজ কৃষ্ণ চূড়ার লালে
লেগেছে রং ডালে ডালে
সেই রং হৃদয় ছড়াক
বাজেরে বাজে ঢোল আর ঢোল
এলেরে পয়লা বৈশাখ”।

ক্যাম্পাসের কাপল বেঞ্চ গুলো এখন ফাঁকা।
কোথায় নেই কারো পদচিহ্ন। নেই কানো
মানুষের পদচারণা।ধুলো জমে স্তুপে পরিনত হয়েছে সেই কাপল বেঞ্চ।
রাতের আকাশে হলের ছাঁদে বসে চাঁদ দেখা এখন আর হয়ে ওঠে না।
কিংবা হয়ে ওঠে না এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে নিজেকে সঁপে দেই বৃষ্টি দেবীর কাছে।
ভিজতে ভিজতে এখন আর বলা হয় না,
“যদি মন কাঁদে
তুমি চলে এসো, চলে এসো
এই বরষায়”।

এসব এখন স্বপ্নের অন্তরালে স্বপ্নে রুপ নিয়েছে।ক্যাম্পাসের আরেক চমক হলো “প্যারিস রোড”
মর্মঘাতী নিশীথে রাস্তার মাঝে এখন গান গাওয়া হয় না।শোনা যায় না সেই ডাকাডাকি, চিল্লাচিল্লির প্রতিধ্বনি।
নিমগ্ন রাতে এখন আর বলা হয় না যে,দোস্ত খেলার মাঠে চল।বাকিটা প্রহর নির্ঘুম কাটিয়ে দিবো।
এসব এখন কেবলই অলীক কল্পনা।

স্যার ম্যামদের জ্ঞান গর্ব কথা এবং অসাধারণ ভঙ্গিমায় উপস্থাপিত ক্লাস এখন আর করা হয় না।
হয়ে ওঠে না,জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির বিবেক,জাতির পথপ্রদর্শক সেই শ্রদ্ধাভাজন পিতৃতুল্য শিক্ষকদের কাছে থেকে জ্ঞান আহরণ করা।
যদিও অনলাইন ক্লাস হয়,কিন্তু তাতে কি আর হৃদয় জুড়ায়!!!

এখন আর স্যার ম্যামরা বলেন না ইয়া বড় এসাইনমেন্ট, ইয়া বড় ক্লাস টেষ্টের কথা।
এটেন্ডেন্সের পাঁচ নম্বরের জন্য এখন আর দাড়িয়ে বলা হয় না ম্যাম উপস্থিত, স্যার উপস্থিত।
সব কিছু এখন কাল্পনিক অস্তিত্বে উপলব্ধি করার বিষয়।

এখন বাড়িতে বসে বসে শুধু স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করি।স্মৃতির পাতা অদল-বদল করে ভেবে ক্লান্ত সেই সোনালি অতীত।
অতি শ্রীঘ্রই সূর্যের উচ্চহাস্যে হাসি ফুটবে সহস্র মানব হৃদয়ে ও বদনে। আবার ফিরে পাবো আমাদের কনকময় অতীত। বিশ্ব ফিরে পাবে তার সজীবতা। আপন অভিপ্রায় পূর্ণ হওয়ার উল্লাসিত হবে আপন মুখ, প্রিয় ক্যাম্পাস।

লেখক: মিজানুর রহমান কাব্য
বাংলা বিভাগ (২য় বর্ষ), বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।