ঝুলে আছে ভান্ডারিয়া পৌর নির্বাচন, নাগরিক সেবা ব্যাহত

মামুন হোসেন, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর)।।
পৌরসভা গঠন করার ৫ বছর অতিবাহিত হলেও আজও ভান্ডারিয়া পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। একটি ভাড়া ঘরে অস্থায়ী কার্যালয় নিয়ে ও প্রশাসক দিয়ে চলছে পৌরসভার কার্যক্রম। উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ পর্যায়ক্রমে পৌর প্রশাসক এর দায়িত্ব পালন করছেন। পৌরসভা গঠনের পর পর সীমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়ায় আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। সে থেকে বন্ধ হয়ে যায় নির্বাচন প্রক্রিয়া। এ কারণে শুধু পৌরসভা নয় উপজেলার নদমূলা-শিয়ালকাঠী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনও বন্ধ রয়েছে। কবে নির্বাচন হবে এবং কবে নির্বাচিত মেয়র পাবে পৌরবাসী তা জানেন না। আর নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় আটকে আছে এলাকার উন্নয়ন ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম। ক্ষোভে ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে পৌরবাসীর অনেকে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রী সভার প্রশাসিন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) এর এক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ প্রজ্ঞাপন জারি করে ভা-ারিয়া পৌরসভা ঘোষণা করা হয়। ২০১১ সালের আদম শুমারী অনুসারে ১ হাজার ১ শত ৯২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ‘গ’ শ্রেণির এই পৌরসভার জনসংখ্যা ৫১ হাজারের ২ শত ৩৩ জন । মোট ভোটার সংখ্যা ১৯ হাজার ৭শত ৩০ জন। পুরুষ ভোটার ৯ হাজার ৭ শত ৩৭ জন, মহিলা ভোটার ৯ হাজার ৯ শত ৯৩ জন । নবগঠিত এ পৌরসভাটি পিরোজপুর জেলার চতুর্থ ও বরিশাল বিভাগের ২৬ তম পৌরসভা। আজও এ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসক দিয়ে পৌরসভার সকল কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

ভান্ডারিয়া সদর ইউনিয়নের লক্ষিপুরা, ভান্ডারিয়া, কানুয়া, গাজীপুর ও ২নং নদমুলা শিয়ালকাঠী ইউনিয়ানের শিয়ালকাঠী গ্রামের কিছু অংশ নিয়ে ভান্ডারিয়া পৌরসভার সীমানা নির্ধারণ করা হয়। নদমুলা শিয়ালকাঠী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ শফিকুল কবির বাবুল তালুকদার পৌরসভার সীমানা নির্ধারণকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন, ওই মামলাটি খারিজ হয়ে গেলে তিনি ২০১৮ সালে ১১ জুলাই আবারো উচ্চ আদালতে আরও একটি মামলা দায়ের করে। অপরদিকে ২০১৬ সালের ১৩ আগষ্ট দক্ষিণ ভান্ডারিয়া গ্রামের কমিশনার জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার সীমানা সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ে উচ্চ আদালতে আরোও একটি মামলা দায়ের করেন। দুটি মামলার কারনে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে যায় পৌর নির্বাচন। এক পর্যায়ে উচ্চ আদালতের এক আদেশে এ মামলা স্থগিত হয়ে যায়। এতে নির্বাচন প্রক্রিয় ঝুলে আছে। হতাশ হন পৌরবাসী। ফলে পৌর সভা সৃস্টির পর থেকে তারা নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর পাইনি। প্রশাসক দিয়ে চলছে পৌরসভা। তাই পৌরবাসীরা উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত মামলাটি প্রত্যাহার করে নির্বাচনের দাবি করেছেন।

পৌরসভার বাসিন্দা উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার আব্দুর রশিদ হাওলাদার, পৌর বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন তালুকদার, কুদ্দুস সিকদার সহ অনেকে জানান, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সব কর্মকান্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কলেজ রোড, টি.এন্ডটি রোড, ওভার ব্রীজ রোড, হাসপাতাল রোড, থানা রোড, লঞ্চঘাট ও লক্ষীপুরা সড়কের বেহাল দশা। দীর্ঘদিন সংস্কার কাজ না হওয়ায় কার্পেটিং উঠে ছোট বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব সড়কে যানবাহনগুলো ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। অধিকাংশ সড়কে খুঁটিতে বাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর ভুতুরে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অন্ধকার থাকায় মাঝে মাঝে এসব সড়কে ছিনতাই হয়ে থাকে। ড্রেনগুলোর বেহাল অবস্থা। অনেক ড্রেনের স্ল্যাব নেই। সংস্কার না করায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এছাড়াও,মশা-মাছি উপদ্রব,ময়লা আর্বজনার দূর্গন্ধ ও পৌর শহরে প্রধান সড়কগুলোতে শত শত বেওয়ারিশ কুকুরের মিছিলে আতংক বিরাজ করছে। গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শহরের সবজি ব্যবসায়ীসহ দোকানীরা। ফলে নানা দুর্ভোগে রয়েছেন পৌরবাসী। এসব কারনে নাগরিক সেবা শূন্যের কোঠায় বললেই চলে। তারা আরো জানান, কোনও সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অনেকে পৌরসভায় ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করেছেন। ক্ষুব্ধ পৌরবাসী দ্রুত এ সমস্যা নিরসন করে অতিদ্রুত পৌরসভায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

নাম না প্রকাশের শর্তে একাধীক ব্যক্তিরা জানান, একটি চক্র পৌর নির্বাচন আটকে রেখেছে। এক চেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করার জন্য এ মামলা করা হয়েছে। যাতে আর কোন দিন পৌরসভা ও নদমূলা ইউপি নির্বাচন না হয়। আর এই ফাঁকে এসব অনির্বাচিত কাউন্সিলররা কৌশলগত ভাবে সব সুযোগ-সুবিদা ভোগ করে চলছে।

ভান্ডারিয়া নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ মোস্তফা কামাল জানান, হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন থাকায় ভা-ারিয়া পৌরসভা নির্বাচন দেশের ২৩৪ পৌরসভার সঙ্গে করা সম্ভব হয়নি।

ভান্ডারিয়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল আলম সাংবাদিকদের জানান, ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হওয়ার কারণে চাহিদামত বরাদ্দ পাওয়া যায় না। এ পৌর সভায় জনবল সংকট রয়েছে ও আবার পৌরবাসীরা ঠিকমত ট্যাক্স দেন না।

তিনি জানান, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় পৌরবাসী কাঙিক্ষত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এদিকে পৌর ভবন নির্মানের জন্য পিরোজপুর-০২ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার ব্যক্তিগত জমি থেকে পৌর সভার নামে ১ শত ৩০ শতাংশ জমি লিখে দেন।