মেহেন্দিগঞ্জ কেন উত্তপ্ত, কেন একের পর এক হত্যাকাণ্ড?

রূপালী ডেস্ক।।
উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলর রাজনৈতিক অঙ্গন। একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা তো ঘটছেই, ঘটেছে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড। এসব কারণে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে উপজেলাটি। ভবিষ্যতে আরও হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে কেন এই সহিংস পরিবেশ তৈরি হলো?

স্থানীয় সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই মূলত এর সূত্রপাত। মাত্র ৪০ দিনের ব্যবধানে ৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বিভিন্ন সময় দলটির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছে অনেকে। ভাংচুর হয়েছে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি। এসব ঘটনায় পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য পংকজ নাথ।

গত ২০ এপ্রিল উপজেলার উলানিয়ার উত্তর ইউনিয়নের সলদি লক্ষ্মীপুর গ্রামে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। এতে দুই ব্যক্তি খুন হন, আহত হন কমপক্ষে ১৫ জন।

নিহতরা হলেন- ধুলখোলা ইউনিয়ন যুবলীগের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক জামাল ঢালী গ্রুপের সিদ্দিকুর রহমান ও ছত্তার ঢালি। নিহত ছত্তার জামাল ঢালীর চাচাতো ভাই এবং সিদ্দিক ওই বাড়িতে কাজ করেন।

স্থানীয়রা জানায়, ধুলখোলা ই্উনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামাল ঢালী (জেলা আওয়ামী লীগের অনুসারী) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) এবং ধুলখোলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কালাম বেপারী (পংকজ নাথের অনুসারী) নৌকার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে দুজনই পরাজিত হন। জয়ী হন বিএনপি প্রার্থী। সেই থেকে দ্বন্দ্বের শুরু। কিছু ঘটলেই দুই পক্ষের অনুসারীরা জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষে।

এর অগে ১১ এপ্রিল মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়নের সুলতানী গ্রামে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জেরে সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। আহত হন কমপক্ষে ১০ জন।

নিহতরা হলেন- আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রুমা বেগমের সমর্থক সাইফুল সরদার (জেলা আওয়ামী লীগের অনুসারী) ও আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মিলন চৌধুরীর চাচাতো ভাই সাঈদ চৌধুরী (পংকজ নাথের অনুসারী)।

স্থানীয়রা জানান, উলানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারেক সরদার ও তার লোকজনদের সঙ্গে মিলন চৌধুরী, মিজান মোল্লা, নোমান মোল্লাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে। যাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে একাধিক হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটেছে। ঘটনার দিন ভোররাতে মিলন চৌধুরী, মিজান মোল্লা, নোমান মোল্লার নেতৃত্বে শতাধিক কথিত সন্ত্রাসী ধারালো অস্ত্র নিয়ে কালীগঞ্জ বাজার এবং আশপাশের এলাকার বাড়িঘরে অতর্কিতে হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের কোপে সাইফুল ইসলাম নিহত এবং ১০/১২ জন আহত হন। এ সময় সন্ত্রাসীরা কয়েকটি বাড়ি ভাংচুর করে মালামাল লুট করে।

দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লিটন বলেন, রাত ৪টার দিকে কয়েক শ’লোক একত্রিত হয়ে দেশি অস্ত্র দিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। হামলাকারীরা এলাকার দোকান ও ঘরবাড়ি ভাংচুর করে। এলাকার বাসিন্দারা প্রতিরোধ করতে গেলে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে দু’পক্ষের দু’জন মারা যান। হামলাকারীরা উলানিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। তারা চেয়ারম্যান প্রার্থী মিলন চৌধুরীর লোক বলে দাবি করেন লিটন।

গত বছর ৪ ডিসেম্বর মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিন পুলিশ সদস্যসহ ৩৩ জন আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ওই সময় পুলিশ ৪৬ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। দুই পক্ষের সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়।

একই বছরের ৭ ডিসেম্বর উলানিয়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতাসহ ৪ জনকে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখম করা হয। এ সময় স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের বাড়িঘর ভাংচুর ও মালামাল লুট করার অভিযোগ রয়েছে।

৮ ডিসেম্বর উলানিয়ার পশ্চিম সুলতানী ও যাদুয়া গ্রামে আনারস মার্কার (বিদ্রোহী) প্রার্থীর নেতৃত্বে নৌকার সমর্থকদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে নৌকার সমর্থকদের ১৯টি বাড়ি, ২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুরসহ ধারালো অস্ত্রের কোপে ২০ জন আহত হন।

আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতা গণমাধ্যমকে বলেন, এখানে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপকে সরাসরি মদদ দিচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগ। অপর গ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ করছেন এমপি পংকজ নাথ। পংকজ নাথ জেলার নেতাদের গুরুত্ব দিচ্ছেন না। একইভাবে জেলার নেতারাও পংকজ নাথকে উপেক্ষা করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের ক্ষমতা বিস্তারে তুচ্ছ ঘটনায় ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। যার ফলাফল একটি পর একটি হত্যাকাণ্ড।

গতবছরের ডিসেম্বর থেকে এ ধরনের সংঘর্ষ ঘটতে থাকলেও সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে জেলা আওয়ামী লীগের কাউকে কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

বরিশালের জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হাসান বলেন, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ চার হত্যাকাণ্ড। এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য দুই ইউনিয়নে দুটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খোরশেদ আলম ভুলু বলেন, স্থানীয়ভাবে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদকদের হস্তক্ষেপ দরকার। না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

এ সকল ঘটনার জন্য সংসদ সদস্য পংকজ নাথকে দায়ী করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি তালুকদার মো. ইউনুস। অন্যদিকে পংকজ নাথ দায়ী করেন তালুকদার মো. ইউনুসকে।