গোপন সীমানা (পর্ব-৫)

শামীম তালুকদার।।
শেষ পর্যন্ত আব্দুল আলিমের ইন্দোনেশিয়ান প্রেমিকা বললেন সমস্যার সমাধান হয়েছে আর দেশে যেতে হবেনা। অর্থ হাতিয়ে নিতে তার প্রেমিকা অন্তসত্বা হওয়ার একটা নাটক সাজিয়েছিল। আব্দুল আলিম আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন। প্রায় একবছরে ভবনটির কাজ সম্পন্ন করে হস্তান্তর করি। সৌদিআরব থেকে লন্ডনে যাওয়ার প্রসেস করে থাকেন এখলাছুর রহমান নামে এক ব্যাবসায়ী। তিনি রিয়াদ শহরে থাকেন। তার মাধ্যমে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে লন্ডনে পৌছেছেন। মাঝে মধ্যে তার সাথে মুঠোফোনে কথা বলে মনকে সতেজ করে নেই।

তায়েফের মাটিতে আমার এক অনন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্টান। এর পর এক সাথে তিনটি ভবনের চুক্তি করলাম। পাকিস্তানের পেশাওয়ারের বাসিন্দা (বিএমএক্স) নামে বিশাল এক পেইন্ট কোম্পানির মালিকের সাথে পরিচয় হল। তায়েফে তিনি খাঁন ছাহাব নামে বেশ পরিচিত। শহরের কুবরি হাল্লাক (ব্রিজ) এর নিকটবর্তী তার রংয়ের দোকান। এই দোকান থেকে রং নিতে শুরু করলাম। এরিই মধ্যে হাছাছ এলাকায় আরেকটি পাঁচ তলা ভবনের কাজ পেয়ে কফিলকে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করার কথা বলি। কিন্ত কফিল আব্দুল্লাহ সালেহ তুরমানী বলেন আপাদত আর চুক্তি করা যাবেনা। কয়েকমাসের মধ্যেই তার একটি বহুতল ভবনের কাজ করতে হবে। এর পরও আমি চুক্তি না করেই ভবনটির কাজ শুরু করলাম। দশ থেকে বার জন লোক আমার এই ঠিকাদারি প্রতিষ্টানে কাজ করছেন। কাজ শেষ করার পর ভবন মালিকদের কাছ থেকে একে একে হিসাব বুঝে নিয়ে পর্যায়ক্রমে ভবনগুলি হস্তান্তর করি। কফিলকে তার কমিশন দেওয়ার পর আমার প্রায় পনের হাজার রিয়াল লাভ হয়। আলহামদুল্লিাহ, আমি মহা খুশি এই ভেবে যে স্বপ্নের শহর লন্ডনে যেতে ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশ হাজার রিয়াল লাগবে। সেই হিসাবে অর্ধেক পথ এগিয়ে গেছি।

চারজন লোক সঙ্গে নিয়ে কফিলের পাঁচতলা ভবনের কাজ শুরু করেছি। পুরো ভবনের বাহির ও ভিতর রস্বা (টেক্সার) করা হবে। দেয়াল ও সিলিংয়ে পাথর ঘষা ও সিরিষ করার পর পানি দিয়ে ধৌত করা শেষ। দেয়াল শুকানোর পর আছাছ (প্রাইমার কুট) করেছি। কফিলের কাছে টাকা চেয়েছি। তিনি প্রথম দফায় তিন হাজার রিয়াল দিলেন। কিন্ত শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে কিছু থাকছেনা। ছাঁদে মাজন (পুটিং), দেয়ালে টেক্সার (রস্বা) শেষ হলে তিনি অনুরূপ ভাবে তিন হাজার রিয়াল করে দেন। দেয়াল ও সিলিংয়ে ফাইনাল কুট, দরজা জানালার গ্রিলের কাজ সম্পন্ন করে চুড়ান্ত হিসাব করার সময় এখন। ভবনের মাপ জোক করে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মিটার, একশতটি দরজা এর মধ্যে দশটি (মাগানো) বার্নিশ। আব্দুল্লাহ সালেহ তুরমানি প্রতি মিটার দুই রিয়াল, দরজা ত্রিশ রিয়াল ও মাগানো (বার্নিশ) দরজা একশত রিয়াল ধরে হিসাব করেন। তিনি বললেন এইটা আমার নিজের ভবন। সেই সময় রস্বা (টেক্সার) এর মার্কেট রেইট সাড়ে তিন রিয়াল, দরজা পঞ্চাশ রিয়াল, মাগানো (বার্নিশ) আড়াইশত রিয়াল। আমি হতবাক হয়ে গেলাম। কোন আপিল করার সুযোগ নেই। এই ভবনটিতে আমার ছয়মাসের শ্রম বিনামুল্যে দেওয়া পরও সাত হাজার রিয়াল পকেট থেকে দিয়ে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করি।

প্রবাস জীবনে এই ঘটনা আমাকে মারাত্বক ভাবে আহত করেছে। যে দিকেই থাকাই হতাশা আর অন্ধকার। কফিলের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। কয়েকমাস ধরে বেকার দিন কাটছে। কোন কাজ পাচ্ছিনা। ঘর ভাড়া, খাবার দুই মাসের বকেয়া হয়ে পড়েছে। পেশাওয়ারের খাঁন ছাহাব এর নিকট থেকে পাঁচশত রিয়াল করে দ্বার নিয়ে আড়াই হাজার রিয়াল দেনা হয়েছি। এখন দ¦ার চাইতে লজ্জা লাগে। হঠাৎ এক ঠিকাদার বললেন তিনি একটি বহুতল ভবনের বাহিরে রংয়ের কাজ করছেন। তার লোক প্রয়োজন। বহুতল ভবনের আড়ের উপর দাঁড়িয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার নেই। কিন্ত পেটে বিষম ক্ষুদা। ক্ষুদা নিবারন করতে হলে পাঁচতলা ভবনের উপরে দাঁড়াতে হবে। চোখ বন্ধ করে হ্যা বলে দিলাম। পরদিন সকালে দরজার সামনে গাড়ী হাজির। গাড়ীতে উঠে বসলাম। ভবনের পাশে গিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছি। কালিমা পড়ে নিলাম। গান (স্প্রে) হাতে নিয়ে লোহার শিকলে বাঁধা আড় বেয়ে একবারে পাঁচলা ভবনের উপর ভাগে গিয়ে পাট্টা (তকথার) উপর দাঁড়ালাম। একটু নিচের দিকে থাকাতেই দেখলাম নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো পিঁপড়ের মত দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি শ^াস প্রশ^াসে ইয়া আল্লাহ জিকির করেছি। ঠিকাদারকে বিষয়টি বুঝতে দেইনি। এভাবে এক তলা করে যত নিচে নামছিলাম ততই সাহসের সঞ্চয় হচ্ছিল। রোজ তিনশত রিয়াল করে পারিশ্রমিক পেয়ে বেশ কয়েকদিন কাজ করে দেনা পরিশোধ করি।

তায়েফ শহরে সর্বোচ্ছ পাঁচতলা ভবনই চোখে পড়েছে। কিছু দিন পর একটি নান্দনিক পাঁচতলা ভবনের কাজ পেলাম। দেয়ালে নান্দনিক রংঙে রং তুলিতে চিত্র অংকন। সেদেশে বলা হয় তাতিক তারখিম। এই ডিজাইনের কাজ করে থাকেন মিশর ও মরূক্ক, মাগরিবি লোকেরা। অন্য কেউ যেনো কাজ না শিখে তাই রাতের বেলা বাতি জ¦ালিয়ে দরজা বন্ধ করে তারা কাজ করে থাকতেন। কোন এক রমজান মাসে রাতের বেলা একটি ভবনের কাজ করছিলাম। পাশের ভবনে এক মাগরিবি তাতিক তারখিমের কাজ করছিলেন। আমি প্রতি রাতেই আমার ভবরেন একটি কক্ষের বাতি নিবিয়ে জানালা দিয়ে লুকিয়ে দেখতাম। এর পর পেশওয়ারের খান ছাহাবের পেইন্টের দোকানে বসে আরও ধারনা নিয়ে বাস্তবে প্রয়োগ করে সফল হই।

এই সেই প্রবাস। তখনো মুঠোফোন সচরাচর হয়নি। বাড়িতে চিঠি লিখে পাঠাতাম। নিজের নামে পোষ্ট বক্স করেছিলাম। প্রতি সপ্তাহে একদিন বক্স দেখতে যেতাম। চিঠির শুরুতেই লিখেছি ‘এলাহি ভরসা’। চিঠি ও চিঠিতে এলাহি ভরসার বিলুপ্তি ঘটলেও এখনো এলাহি ভরসায়-ই বেঁচে আছি। যতদিন বেঁচে থাকি এলাহি ভরসায় বেঁচে থাকব। স্বপ্ন গুলোও এলাহি ভরসা। আল-বাহার আল-মান্ডাক এলাকায় যখন ছিলাম কয়েকবার উমরাহ হজ¦ পালনে যেতে চাইলে আব্দুল্লাহ আলি বাদশা ও হাসান মর্দি রমাদ্ধান আল জাহরানী যেতে দেয়নি। ভাবছি এবার ওমরাহ হজ¦ পালন করতে হবে। পরদিন কফিলের কাছে গিয়ে (ওয়ারাকা) অনুমতি পত্র চেয়ে নিলাম। তখন এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে হলে কফিলের প্যাডে অনুমতি পত্র নিতে হত। তা না হয় চেক পোষ্টে পাস দিবেনা। ওমরাহের কাপড় পরিদান করে পবিত্র মক্কা পৌছালাম। আলিম উলামাদের বয়ানে শুনেছি মক্কা শরীফে প্রবেশ করে প্রথম যে দোয়া করবেন তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়। আমিও কাবা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে দোয়া করে নিলাম। হে! আল্লাহ, জীবনে একবার হলেও আমাকে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে নিও, দুনিয়া ও আখেরাতে আমার জন্য কল্যানকর হলে ইবানা রহমানকে আমার জীবন সাথী হিসাবে কবুল করে নিও।(চলবে–)

লেখক: সাংবাদিক।