কেপলারে কিছুক্ষণ

কেপলারে কিছুক্ষণ
-এ কে সরকার শাওন

বৈসাদৃশ্যময় সব্জি উপকরণে তৈরি পুষ্টিমানে ভরপুর মিশ্র খাদ্য “সব্জি-খিচুড়ি” পাকানো হচ্ছে বিশাল মাঠে। রাজ্যের সবাই খাবে। নো দাওয়াত! আপন মনে করে আসলে দাওয়াত লাগে না! এটা জগ্লুর কথা নয়। এখানকার ভলান্টিয়ার দলনেতা খরগোস দা’র কথা। সূচনা বক্তব্যের মাঝে তিনি এমনটিই বলেছেন। তাঁর সাথে আলাপ করে জগ্লু জানতে পারলো এখানকার গ্রহটির আসল নাম কেপলার-৪৫২বি৷এখানে অ্যানিম্যালদের জয় জয়াকার বিধায় সবাই ভালবেসে গ্রহটিকে এ্যনিম্যাল্ট বলে। পৃথিবী থেকে প্রায় ১,৪০০ আলোকবর্ষ দূরের এ্যনিম্যাল্ট গ্রহটি পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বড়৷ এই গ্রহে ৩৮৫ দিন বছর হয়। এই গ্রহের সূর্যের বয়স অবশ্য সৌরজগতের কেন্দ্রের চেয়ে ১০০ কোটি বছরেরও বেশি।

ইতিমধ্যে কোমল সবুজ ঘাসে সবার মধ্যমনি হয়ে আসন গ্রহন করেছেন সম্মানিত ক্যাট সাহেব । তিনি এসেছেন মৎস আকৃতির একটি বিশেষ মাস্ক পরে। যদিও এ্যনিম্যাল্ট গ্রহে করোনা এখনো হানা দেয় নি তথাপি ব্যাপক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে এখানে। ক্যাট সাহেব এই এ্যনিম্যাল্ট গ্রহে দাদা সদৃশ্য। সে ডগ্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ্যারোন্যটিক্সে স্নাতকোত্তর অতিশয় রাশভারী গুনীজন। গণ্যমান্য তো বটেই। তিনি সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে হৈ চৈ না করে আসন গ্রহনের বিণীত অনুরোধ জানিয়েছেন।

এ্যনিম্যাল্ট গ্রহের প্রাণীগণ খুবই শান্তিপ্রিয়। Calm & tranquil এবং pin drop silence পরিবেশ এদের পছন্দ। নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীদের তিনি মাস্কের ব্যাপারে কড়া হুশিয়ারী দিয়ে সাবধান বাণী দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “Zero tolerance regarding mask issue. No single entry here without mask he or she may be anything else. তিনি আরো বলেছেন মনুষ্য সমাজ ক্রমাগত পাপাচারে লিপ্ত থাকা ও হানাহানির ফলে আজ করোনা ঝড়ে বিধ্বস্ত। ওরা অহংকারে সেরা, ঔদ্ধত্বে সেরা, মারামারি, কাটাকাটি, রাহাজানি ও অনাচারে সেরা। চাপাবাজি ও চিটারীতেও ওরাই সর্বসেরা। ওরা সেই পাপের ফল ভোগ করছে। ইংরেজীতে একটি কথা আছে, ” Every action there is an equal & opposite reaction”. তা’ছাড়া Natural Justice বলতে ও একটি কথা আছে। আমি পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছি ওদের সাথে মেশা যাবে না। ওরা যেই পাত্রে খায় সেই পাত্রেই ইয়ে করে। আজ ওদের কোন পশুবতা নাই। তবে সেখানে অনেক পূজনীয় মনিষী ছিলো। এখনো হয়ত আছে। কলিকালে তাদের কে মূল্য দেয়! করোনার আগাম সতর্কতা হিসাবে সবার শরীরে পুষ্টি বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে এই সব্জি-খিচুড়ির কার্যক্রম চলবে সব রাজ্যে। ক্যাট সাহেবের তত্বাবধানে সরকারি খরচে সারা রাজ্যে সব্জি-খিচুড়ি অনুষ্ঠান সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বলা যায় এটা একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

দুটি শালিক লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এর মধ্যেও কানাকানি করেই চলেছে সঙ্গোপনে। ওদের একটা দল যথেষ্ট কিচিরমিচির যা চেচামেচির পর্যায়ে পড়ে গিয়েছিলো বিধায় মাননীয় শেয়াল পন্ডিত লাল কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি সিনিয়র সিটিজেন অ্যাসোসিয়েশান এর সম্মানিত সভাপতি। এই এ্যনিম্যাল্ট গ্রহের সব রাজ্যেই গুরুজনদের আদেশ শিরোধার্য। সবাই অত্যন্ত সমীহ করে চলে বয়স্কদের।

ডিওজি সাহেব গেটগুলো ও দেয়ালের নীচে উপরে ফাঁক ফোকর দিয়ে যাতে কোন কিছু অনুষ্ঠান স্থলে প্রবেশ করতে না পারে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গেলেন। তিনি গোটা রাজ্যের নিরাপত্তা প্রধান। কাক ও বোলতারা তাঁর নির্দেশেই সকাল সন্ধা পরিশ্রম করে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে অতন্দ্র প্রহরীর মত! ক্যাট সাহেবের কড়া হুকুম যে কোন মূল্যে সব্জি-খিচুড়ি অনুষ্ঠান গুনে ও মানে এলিয়েনদের চেয়ে সেরা হতে হবে। স্থানে স্থানে বড় অক্ষরে বিভিন্ন ভাষায় লিখা আছে, Aliens & snakes are not allowed here.

কিছু পাতিকাক সুরেলা গলায় কা কা কা সারগামে উচ্চাঙ্গ সংগীত গাইছে। প্রাণীকুল যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করছে। কোকিল অক্লান্ত পরিশ্রম করে কাকদের আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। প্রাণী চেষ্টা করলে কি না পারে! শহর থেকে শিল্পী সমাজের নয়নমনি দু’টো দাড়কাক কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে বলে কোট টাই পরিহিত সম্রান্ত একটি দাড় কাক ঘোষণা দিয়ে গেছে। সে আরো জানালো প্রতিকুল আবহাওয়ায় হলে ও বারান্দায় বসে খাবার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ফড়িং প্রজাপতিরা কোন আইনের তোয়াক্কা না করে তাদের খেয়াল খুশীমত উড়াউড়ি করছে। এ ব্যাপারে ক্যাট সাহেব বলেছেন, ” ফড়িং প্রজাপতি, ভ্রমর হলো শিশুর মত। ওরা তাঁদের ইচ্ছেমত চলবে, উড়বে ও ঘুরে বেড়াবে। ওদের জন্য কোন আইন নাই।

হেরন, বক ও কিংস্টর্ক বকের জন্য বিশেষ খিচুড়ি স্যূপ তৈরী করেছে দোয়েল। যাদের লম্বা চঞ্চু তাদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা। কুমীর সেখানে সম্মানিত অতিথি হিসাবে যোগ দেবার কথা রয়েছে। মূল ছামিয়ানার বাম পাশে কফি ডিসপেনসারির পাশে একটি টিপ টপ অস্থায়ী মেডিকেল সেন্টারও রয়েছে! সম্মানসরূপ মহিলাদের বিনামূল্যে মৌয়া নামে একটি আচার দেয়া হচ্ছে যা মধু আমের সমন্বয়ে তৈরি করেছে বাবুই ও টুনটুনির দল। এদের কর্ম দক্ষতা দেখে একজন প্রকৌশলী হিসাবে জগ্লু লজ্জা পেলো। শিশুদের খুশী করতে বিলি করা হচ্ছে কিশমিশ, চকলেট, আর্ট পেপার ও তুলি। পড়াশুনার পাশাপাশি কালচারাল বিষয়গুলোর উপর নজর দেয়াই এই উপহারের লক্ষ্য!

মৌমাছির সম্প্রদায় এ উৎসব বয়কটের ডাক দিয়েছে। মধুতে জন্ম, মধুতে বসবাস, মধুতেই ওদের মৃত্যু; তাই অহংকারে ওদের পা পাতায় পড়ে না। তাঁরা সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে এহেন নীচু শ্রেণির খাবারে তারা অভ্যস্থ না। তবে উৎসব সুচারুভাবে সম্পন্ন হোক তা তারা চায়। যা তাদের লিখিত বক্তব্যে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে।

টিকটিকি ও ফড়িং অভ্যর্থনায় রয়েছে। মাঠে কেহ প্রবেশ করলে “টিক” “টিক” “টিক” বলে টিকটিকি সাদরে বরণ করে মূল ছামিয়ানার নীচে এগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানের বক্ত্যব্য পর্বে বানর শাবকেরা সুচারুভাবে সবাইকে কফি পান করিয়ে গেলো ।
বানরেরা অতিশয় বুদ্ধিমান ও ক্ষিপ্র গতি সম্পন্ন। ওদের বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জাতি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে বলে গেলেন একটি উঠতি বয়সের বানর নেতা।

কয়েকজন লম্বা চুলওয়ালা শালিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের দায়িত্বে রয়েছে। কোন এক তোতা পাখির লিখা গ্রামীন গানের মিউজিক চলছে। খুবই ভালো লাগছে। কেমন যেন একটা স্বপ্নীয় স্বর্গীয় ভাব চলে এসেছে। সবকিছু ছবির মত লাগছে।

এই মুহূর্তে সব চুপ। যাকে বলে পিন ড্রপ সাইলেন্স। হিজ এক্সিলেন্সি সদাশয় হাতী মহাশয় এখন দিকনির্দেশনা সম্বলিত বক্তব্য রাখবেন। এবং খাবার কার্যক্রম শুরু করবেন। তিনি এ্যনিম্যাল্ট গ্রহে প্রশাসনিক বডির সম্মানিত চেয়ারম্যান। কাজে বিশ্বাসী বলে এরা খুব কম বক্তব্য রাখে। এরা বলে মানুষ যা যা করে তা পরিহার কর। তাহলেই এ্যনিম্যাল্ট গ্রহ স্বর্গীয় হয়ে উঠবে। এখানকার এ্যানিমি ইউনিভারসিটির উপাচার্য সিংহ মহাশয় পিছনে পিছনে থেকে হাতী মহাশয়কে সাহায্য করছেন। মাইক, প্যান্ডেল, আলো ও সাজ-সজ্জার দায়িত্ব পালন করছে নিরামিষ ভোজী ব্যাঘ্র সম্প্রদায়। চেয়ারম্যান সাহেব মাইকের সামনে গিয়ে বক্তব্য দিতে গেলে সবাই করতালির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানাচ্ছে

মাননীয় ক্যাট সাহেব, উপস্থিত সুধী বৃন্দ, শুভ দুপুর। সবার দেহে পুষ্টি নিশ্চিত করতে আমাদের এ্যনিম্যাল্ট গ্রহে এই সব্জি-খিচুড়ি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সবাই ইচ্ছেমতো তৃপ্তি সহকারে এক ধরনের খাবার খাবেন। মনে রাখবেন আমাদের এখানে কোন শ্রণি নেই। আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। আয়োজনের কোথাও ভুল ত্রুটির দায়ভার আমার একার। কোন প্রশংসাসূচক বাক্য নয়। ওগুলো আমাদের এ্যনিম্যাল্ট গ্রহে নিষিদ্ধ। শুধু দয়া করে ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিবেন যা শুধরে আগামীতে আরো ভালো করার প্রতিশ্রুতি দিলাম। আপনাদের সেবায় আমরা সদা নিয়োজিত ও জাগ্রত। খাবার শেষে আপনাদের জন্য গরু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে রয়েছে জনপ্রতি একটি চিনি পাতা দই যা ৫০০ মিলিগ্রামের কন্টেইনারে। সেটি বাড়ীতে নিয়ে যেতে চাইলে নিতে পারেন। এখানেও বসেও খেতে পারবেন। খাবার শেষের সাথে সাথে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি। আর হ্যা, এই এ্যনিম্যাল্ট গ্রহে আমাদের প্রধান কাজ খাওয়া নয়। সৃষ্টিকর্তার গুনকীর্তন করা। সবাই যে যার মত সঠিক সময়ে নিয়মিত প্রার্থনা করবেন। ধন্যবাদ।

এবার মাননীয় ক্যাট সাহেবের সাথে খাবার শুরু। স্বেচ্ছাসেবকগণ ঘুরে ঘুরে কার কি লাগবে তা পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন! হঠাৎ জগ্লুর মোবাইল বেজে উঠলো। জেগে দেখে সে নিজে খাটের উপর শুয়ে আছে। নাক বরাবর উপরে ফ্যানটা হাই আরপিএম এ ভো ভো করে ঘুরছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা তিনটা বাজে। খাওয়া দাওয়া গোছল কিছুই হয়নি! ফোন রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে জগ্লুর স্ত্রী কানিজ জানালো, “এই তুমি দুপুরে কি খেয়েছো?
হাঁ খেয়েছি।
কি রান্না করেছিলে?
জগ্লুর তাৎক্ষণিক জবাব “সব্জি-খিচুড়ি”!

ছোট গল্পঃ কেপলারে কিছুক্ষণ
এ কে সরকার শাওন
শাওনাজ, উত্তরখান, ঢাকা।
রচনা: ২৩ জুলাই ২০২১