হাদিসুরের লাশ না নিয়েই বাড়ি ফেরায় এলাকাবাসীর ক্ষোভ, থামছে না মা বাবার আর্তনাত

গোলাম কিবরিয়া, বরগুনা।।
ইউক্রেনে বোমা হামলায় নিহত হাদিসুর রহমান আরিফের লাশ দেশে ফেরত না আশায় ক্ষোভ এলাকাবাসীর, অপর দিকে পরিবারের আর্তনাত বেড়েই চলছে, কেউ যেন এ অসহায় পরিবারের আহাজারি শুনছেন না। রাজনৈতিক নেতা ও প্রসাশনের আশ্বাস এখন নিরাশায় পরিনত হয়েছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ায় যুদ্ধের সংঘাতে নিহত হন বাংলাদেশি ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে কর্মরত থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. হাদিসুর রহমান। ওই মৃত্যুতে সারাদেশ ব্যাপী নেমে আসে শোকের ছায়া। একটি দূর্ঘটনার সাথে ভেস্তে যায় পুরো পরিবারের স্বপ্ন। নিহত হাদিসুরের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ গ্রামে।

এদিকে নিহত হাদিসুরের লাশ বাংলাদেশে আসবে কিনা এ বিষয়ে ছিলো অনিশ্চয়তা তবে হাদিসুরের বাড়িতে গিয়ে লাশ দু’একদিনে ফিরে পাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন আওয়ামীলীগের কেন্দ্রিয় নেতাসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি বড় সন্তান হাদিসুরকে হারিয়ে দিশেহারা মা বাবা লাশ ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়ে শনিবার (০৪ মার্চ) ঢাকায় যান। ইচ্ছে ছিলো প্রধানমন্ত্রী ও রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে দেখা করবেন, দাবি জানাবেন ছেলের লাশ বাংলাদেশে নিয়ে আসার ও বলবেন অসহায় পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতির কথা। কিন্তু তা আর কোনভাবেই পারলেন না নিহত হাদিসুরের পরিবার। নিহতের ঘটনার সাতটি দিন পার হলেও পূরণ করতে পারেননি নিহত হাদিসুরের পরিবারের কোন ইচ্ছা তাই ব্যর্থ হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি বেতাগীতে লাশ না নিয়েই বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) বিকেলে ফিরে আসেন হাদিসুরের বাবা আব্দুর রাজ্জাক, মা আমেনা বেগম, মেজো ভাই তরিকুল ইসলাম, ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স ও বোন সানজিদা ইসলাম সম্পা। যদিও প্রশাসন বলছেন ২-৩ দিনের মধ্যেই নিহত হাদিসুরের লাশ বাংলাদেশে পৌছাবে। কিন্তু এমন কথায় আর আশ্বস্ত হতে পারছেন না হাদিসুরের পরিবার। এমন ঘটনায় এলাকাবাসীও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নিহত হাদিসুরের ছোটভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স জানান, আমরা ঢাকায় যাই ভাইয়ের লাশ পাওয়ার আশায় এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমরা তাদের সাথে দেখা করতে পারিনি। অনেক কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।বুধবার যখন ওই জাহাজে থাকা ২৮ জন নাবিক বাংলাদেশে আসেন তখন পাগলের মতো হয়ে যাই সবাইকে দেখি জীবিত কিন্তু আমার ভাইয়ের লাশটাও দেখতে পাইনি।

মেজ ভাই তরিকুল ইসলাম জানান, আমাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা ও উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন আমার বড়ভাই হাদিসুর রহমান। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার এখন পথে বসে গেছে। পরিবারের দুরাবস্থার কথা আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চাই ও তার কাছ থেকে সহায়তা চাই।’কিন্তু এখন দেখছি ভাইয়ের লাশ নিয়েই অনিশ্চয়তা। তার সাথে দেখা না করতে পেরে আমরা ৫টি দাবি নিয়ে ঢাকার রিপোর্টার ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনও করি কিন্তু তাতেও কোন কাজ হয়নি। ব্যর্থ হয়েই বাড়িতে আসলাম।

হাদিসুরের বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন,আমাদের আশা ছিলো প্রধানমন্ত্রী এবং রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে দেখা করবো। আমরা দেখা করতে না পেরে হতাশা নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছি। সরকার সহায়তা না করলে আমার ছেলের লাশ দেশে আনা সম্ভম নয়। আমি সরকারের লাশের ছেলের লাশটা চাই।

মা আমেনা বেগম বলেন , গত বুধবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম। ২৮ নাবিকের সাথে হাদিসুরের লাশ ফিরে পাবো এই আশা নিয়ে। বাজানেরে পাইলাম না। বাজানের লাশটা দেইখা মরতে চাই। এসব কথা বলতে বলতে কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: সুহৃদ সালেহীন বলেন, নিহত হাদিসুর রহমান আরিফের লাশ দেশে ফেরত আনতে যে আইনি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা আমি নিচ্ছি। আশা করা যায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার মরদেহ ফেরত আসবে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারলাম দুই-তিনের মধ্যে হাদিসের লাশ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে আশা করছি ।

উল্লেখ্য, সিরামিকের কাঁচামাল ‘ক্লে’পরিবহনের জন্য জাহাজটি তুরস্ক থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরের জলসীমায় পৌঁছায় এবং ২ মার্চ বুধবার রকেট হামলার শিকার হয়। তবে যুদ্ধাবস্থা এড়াতে জাহাজটিকে সেখানে পৌঁছানোর পরই পণ্য বোঝাই না করে দ্রুত ফেরত আসার জন্য নির্দেশনা দেন শিপিং করপোরেশনের কর্মকর্তারা। শেষ মুহূর্তে বন্দরের পাইলট না পাওয়ায় ইউক্রেনের জলসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বাংলাদেশের এই জাহাজ।