দাদি রোকেয়ার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন হাদিসুর

গোলাম কিবরিয়া, বরগুনা।।
ইউক্রেনে রকেট বোমায় নিহত বাংলাদেশি জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধির থার্ড প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান আরিফের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। নিহত হাদিসুর রহমান আরিফের বয়স হয়েছিলো ৩৪ বছর। মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) সকাল বেলা পৌনে ১১টায় সময় তার নিজ বাড়িতে মসজিদের পাশে দাফন করা হয়।

দাদি রোকেয়া বেগমের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় হাদিসুরকে। দাফন শেষে বারে বার কবরের কাছে গিয়ে বাবা-মা আর্তনাদ ও মুর্ছানা করছেন। এসময় অশ্রুশিক্তে আহাজারি করে বলছেন, আমার বাবারে একটু উঠাইয়া দেও, আমি চুমো দেব। তোমরা আমার বাবারে উঠাইয়া দেও।’ কবরস্থানে গিয়ে এমনই প্রলাপ করেছেন হাদিসুরের বাবা আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার। মঙ্গলবার দুপুরে ইউক্রেনে নিহত হাদিসুর রহমান আরিফের দাফনের পর তার কবর জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সবাই আমার বাবার (হাদিসুরের) জন্য দোয়া করবে, ও যাতে জান্নাতে পৌঁছাতে পারে। আমার বাবায় কোনো ভুল করলে সবাই ক্ষমা করে দেবেন।

মা আমেনা বেগম বলেন,ওরে মোর বাজান, তুমি আইছোও লাশ হইয়া,ওরে আব্বারে তুই চলে গেলি না ফেরার দেশে, এহন কেডা মোর খবর নেবে,মোগো তুমি কি কইয়া গেলা, মোগো বুড়া-বুড়িরে এহন কেডা জিগাইবে,কেডা ঔষধ কিন্না দেবে,কেডা খাওয়াইবে,কেডা আদর-যতন হরবে। আমার বাবার স্বপ্নটা পূরন হলো না, হলোনা বাস্তাবায়িত, রয়ে গেলো তার বুকের কষ্ট, হাদিসুরকে দাফন শেষে বৃদ্ধ বাবা আবদুল রাজ্জাক ও মা আমেনা বেগমের আহাজারি কিছুতেই কমছে না।

নিহত হাদিসুরের পরিবারের হতাশা,বেদনা,দু:খ আর দুর্দশার লাগবের দায়িত্ব নেয়ার কেহ রইলো না। অনেক জলপনা,কল্পনার অবসানের শেষে লাশ দাফন করা হয়।

এর আগে ভাইয়ের কফিন ছুঁয়ে ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ছোট ভাই প্রিন্স। সে সময়ের আহাজারিতে বেতাগীর পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেন। তাদের হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে হাজার হাজার মানুষ একবারের দেখতে ভীর জমায়।
মঙলবার সকাল ১০ টায় নামাজে জানাজা শেষে

মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে হাদিসুরকে সমাহিত করা হয়। দাদা আতাহার উদ্দীন হাওলাদার এবং দাদী রোকেয়া বেগমের কবরের পাশেই আদরের নাতিকে সমাহিত করা হয়।

এসময় বরগুনা-২ বেতাগী-বামনা-পাথরঘাটা সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাসানুর রহমান রিমন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠিন পদক্ষেপের কারণে আমরা হাদিসুরের মরদেহ তার বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে দাফন সম্পন্ন করতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দায়িত্ব পালন করেছেন, এ পরিবারের জন্য যা যা বাকি তাহা সব কিছু তিনি করবেন।

ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে আটকে থাকা অবস্থায় গত ২ মার্চ রকেট হামলার শিকার হয় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’। এতে নিহত হন ওই জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান।

ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর রকেট হামলায় নিহত ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান আরিফের (৩৪) মরদেহ নিজ বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কদমতলা গ্রামে ১৪ মার্চ রাত ৯ টা ৪৫ মিনিটে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ীতে করে মরদেহ নিয়ে আসা হয়।

এর আগে আজ বেলা ১২ টা ২০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি কার্গো বিমান হাদিসুরের মরদেহ নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরন করে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা দুপুর দুইটায় হাদিসুরের মরদেহ নিয়ে বরগুনার উদ্দেশ্য রওনা হন স্বজনরা।

হাদিসুরের মরদেহ বাড়িতে আসার কথা পর থেকেই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও প্রতিবেশীরা তার বাড়িতে আসতে শুরু করেন। রাত ৯ টা ৪৫ এ মরদেহ বাড়িতে পৌছলে শুরু হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। হাদিসুরের মা, বোন ও ভাইয়েরা মূর্ছা যাচ্ছেন বারবার। মরদেহ আসার আগেই বাড়িতে অবস্থান করছে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সুহৃদ সালেহীন।

হাদিসুরের খালাতো ভাই সোহাগ হাওলাদার বলেন, হাসিদুরের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিলো। কয়েকদিন পরপর ভিডিও কলে আমাদের কথা হত। আমি এখন কার সাথে কথা বলব।হাদিসুরের মেজো ভাই তরিকুল ইসলাম বলেন, আমার বড় ভাই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। আমি এবং আমার ছোট ভাই যাতে চাকুরি পেতে পারি এজন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন,পরিবারের দাবি ছিল হাদিসুরের লাশ অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে পাওয়া। প্রধানমন্ত্রী সেই আশা পূর্ণ করেছেন।

এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ সুহৃদ সালেহীন নয়াদিগন্তকে বলেন,হাদিসুরের এমন মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। উপজেলা প্রশাসন পরিবারের জন্য সকল ধরনের সহায়তা করবেন।