বরিশাল নগরীতে বর্জ্যের ‘বিষে’ দুঃসহ জীবন

রূপালী ডেস্ক।।
সৌদি আরবে চাকরি করার সময় বরিশাল নগরীর পুরানপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন মেহেন্দীগঞ্জের আফতাব হোসেন। কিন্তু পরিবার নিয়ে সেই বাড়িতে থাকতে পারেননি তিনি। বাড়ি বিক্রি করে তিনি এখন ভাড়া থাকেন নগরীর কাশিপুর এলাকায়। ঠিকাদার এনায়েতুর রহমানও পুরানপাড়ায় বাড়ি করেছিলেন। কিন্তু বর্জ্যের ‘বিষে’ সেখানে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়লে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। আফতাব হোসেন ও এনায়েতুর রহমানের মতো নগরের ৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং পার্শ্ববর্তী ১ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের শতাধিক পরিবার নিজেদের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র ভাড়া থাকে। এ ছাড়া চরবাড়িয়া ইউনিয়নের সাপানিয়া ও উলালঘুণী গ্রামের অর্ধশত পরিবারের জীবনও দুঃসহ হয়ে পড়েছে।

সাপানিয়া গ্রামের বাসিন্দা ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলুল হক খান বলেন, ‘ময়লাখলার দুর্গন্ধে আমরা অসহনীয় জীবনযাপন করছি। এই কষ্ট থেকে মুক্তি চাই।’ নিজ বাড়ি ছেড়ে যাওয়া পুরানপাড়া এলাকার খোরশেদ আলম বলেন, তাদের এমন পরিস্থিতির একমাত্র কারণ নগরীর পুরানপাড়া এলাকার বর্জ্য ফেলার ভাগাড়টি (ডাম্পিং স্টেশন)। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ এমনকি সিটি করপোরেশনের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, পুরানপাড়ায় উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলার স্থান নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী।

সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ডা. রবিউল হাসান বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয়। এটা স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলেছে। তাই করপোরেশনের বাইরে লামচরি এলাকায় ৭ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে ডাম্পিং স্টেশন করার জন্য। কিছু উন্নয়ন কাজ শেষে লামচরির ডাম্পিং স্টেশন চালু হলে পুরানপাড়ার ময়লাখলার আশপাশের বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।

ময়লাখলা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, আশপাশের বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হন নাক চেপে। ময়লাখলা সংলগ্ন হোসনাবাদের বাসিন্দা রাজিয়া বেগম ও রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা দুর্গন্ধের জন্য ঘর থেকে বের হতে পারি না। রোজা রাখা যায় না। আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতেও আসেন না দুর্গন্ধের কারণে। স্থানীয় অনেক মানুষই নিজেদের বাড়িতে থাকেন না।’

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরানপাড়া এলাকার ছয় একর জমিতে ২০০১ সাল থেকে সব ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। ময়লাখলার চারপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তৎকালীন সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত না নিয়েই ডাম্পিং স্টেশন করেছে। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রায়ই রাতে যত্রতত্র ফেলা বর্জ্যে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ধোঁয়া এবং দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষের।

ময়লাখলা সংলগ্ন কাউনিয়া হাউজিং এলাকার ব্যবসায়ী রূহুল আমিন, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নাসির খান, চরবাড়িয়ার উলালঘুণী গ্রামের জাকির হোসেন বলেন, ময়লাখলার চারপাশে এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী সব পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আনসার সদস্য পারভেজ হোসেন অভিযোগ করেন, রাতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যখন বর্জ্যে আগুন দেয় তখন ধোঁয়ার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই ঘর ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান।

কাউনিয়া হাউজিং এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান বলেন, ময়লাখলার চারপাশে ২৫-৩০ ভাগ মানুষ শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন। প্রতিদিন তার ফার্মেসি থেকে আশপাশের বাসিন্দারা কাশির সিরাপসহ শ্বাসকষ্টের ওষুধ কেনেন। উত্তর পাশের চরবাড়িয়া ইউনিয়নের সাপানিয়া গ্রামের আশরাফ আলী খান বলেন, ময়লাখলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাপানিয়া খালের পানি বর্জ্যের কারণে বিষে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হুমায়ন শাহীন খান বলেছেন, উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশন আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। আবাসিক এলাকায় এ ধরনের বর্জ্য ফেলার জায়গা নির্ধারণ করা ঠিক হয়নি।

বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল হালিম বলেন, উন্মুক্ত স্থানে ডাম্পিং স্টেশন করার আইনগত সুযোগ নেই। করপোরেশন কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়েই ডাম্পিং স্টেশন করেছে। এটি স্থানান্তরের জন্য করপোরেশনকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও পদক্ষেপ নিচ্ছে না।  সূএ-সমকাল।