কুয়াকাটার ভাগ্য খুলে দিয়েছে পদ্মা সেতু

এইচ এম হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)।।
বড় দিন ও সাপ্তাহিত ছুটিতে হাজার হাজার পর্যটকে মুখরিত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগমন ঘটে বিভিন্ন ধর্ম ও পেশার ভ্রমণ পিপাসু মানুষের। কেউ সাতার কাটছেন এবং ঘুরছেন ঘোড়ায় চরে, অনেকে আবার সৈকতের সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নাচে গানে মেতে উঠেছেন, কেউবা খেলা করছেন সৈকতের বালু নিয়ে। সৈকতের বেঞ্চিতে বসে উপভোগ করছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ দৃশ্য।

ছুটিতে পর্যটন নগরী কুয়াকাটায় আগমন ঘটেছে রেকর্ড সংখ্যক পর্যটকের। আগত পর্যটকরা এভাবেই সৈকতের বালিয়াড়িতে উন্মাদনায় মেতেছেন। শুধু সমুদ্র সৈকতের জিরো পয়েন্টই নয় এখন পর্যটকদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো শুটকী পল্লী, লেম্বুর চর, তিন নদীর মোহনা, ঝাউবন, লাল কাঁকড়া, গঙ্গামতি ও রাখাইন মার্কেট, রাখাইন তাঁত পল্লী, চর বিজয়, কুয়াকাটাসহ সকল পর্যটন স্পটগুলো। ব্যস্ত সময় পার করছেন হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, মার্কেটসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ীরা। পর্যটকের এমন ভীড়ে বুকিং রয়েছে কুয়াকাটার শতভাগ হোটেল ও রিসোর্ট।

প্রানচাঞ্চল্য হয়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। হাসি ফুটেছে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মুখে। তবে আগত পর্যটকদের কাছে খাবার মূল্য ও হোটেল ভাড়া বেশি রাখা হচ্ছে বলে দাবী পর্যটকদের। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় পর্যটকদের বুকিং বেশি হয়েছে এই হোটেলে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এবার দ্বিগুণ পর্যটক আসবেন কুয়াকাটায়। তাঁদের ধারণা, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর্যটক অনেক বেড়ে গেছে। বহুমুখী এ সেতুর প্রভাবে সমৃদ্ধ হবে কুয়াকাটার পর্যটন শিল্প। প্রাকৃতিক রূপ-লাবণ্যে ঘেরা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। এ জন্য এই সৈকত নিয়ে পর্যটকদের আলাদা আগ্রহ আছে।

লাল কাঁকড়ারচর, গঙ্গামতী, রাখাইনপল্লি, ফাতরার বন, শুঁটকিপল্লি ও চরবিজয়ের মতো অর্ধশত পর্যটন স্পটের টানে পর্যটকরা বারবার ছুটে আসেন কুয়াকাটায়। বছরের পর বছর ধরে ভোগান্তি মাথায় নিয়ে পর্যটকরা কুয়াকাটায় আসতেন সাগর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এখন অবস্থা বদলেছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় রাজধানী ঢাকা থেকে কুয়াকাটা আসতে কোনো ফেরির ভোগান্তি নেই।

একসময় ঢাকা থেকে কুয়াকাটা আসতে ৯টি ফেরি পারের ঝক্কি নিতে হতো। তাতে সময় ব্যয় হতো ১০-১২ ঘণ্টা। পদ্মা সেতু হয়ে এখন ৬ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় আসছেন পর্যটকরা। ফলে এখন থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিপুলসংখ্যক পর্যটক কুয়াকাটায় আসবেন বলে আশাবাদী স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। এবারের শীত মৌসুমে পর্যটকের ঢল নামবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি জানিয়েছে, এখানে তিন তারকা মানের তিন-চারটি হোটেলসহ বিভিন্ন মানের হোটেল-রিসোর্ট আছে প্রায় ১৫০টি। এতে সর্বোচ্চ ১৫-২০ হাজার পর্যটকের আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাই এবার বাড়তি পর্যটকদের আবাসন সেবা দিতে তাঁরা ‘কমিউনিটি ট্যুরিজম’ চালু করবেন।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ বলেন, পদ্মা সেতু কুয়াকাটার ভাগ্য খুলে দিয়েছে। কুয়াকাটাকে শতভাগ পর্যটনবান্ধব হিসেবে তুলে ধরতে তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

কুয়াকাটা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (কুটুম) সভাপতি নাসির উদ্দিন বিপ্লব বলেন, তাঁদের সংগঠনের উদ্যোগে স্থানীয় ট্যুরিস্ট গাইড, ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমিতি, বাইকার ও ফটোগ্রাফারদের নিয়ে সভা করেছেন। তাঁদের পর্যটনবান্ধব মানসিকতা নিয়ে সেবা দিতে বলা হয়েছে।

কুয়াকাটা খাবার হোটেলের একাধিক মালিকগন বলেন, তাঁদের সমিতির আওতায় কুয়াকাটায় ২৫টি খাবার হোটেল আছে। এ ছাড়া আছে অভিজাত তিন-চারটি রেস্তোরাঁ। কিছু ভাসমান খাবার হোটেলও আছে। তাঁদের সমিতিভুক্ত হোটেলগুলো শীত মৌসুমে বাড়তি পর্যটকদের মানসম্মত খাবার পরিবেশন করতে প্রস্তুত রয়েছে। বিভিন্ন হোটেলে শুক্রবার থেকে তিনি পাঁচ ধরনের শুঁটকি ভর্তা করবেন। রান্না করবেন সামুদ্রিক টুনা, লাক্ষ্যা, মেদ, কোরাল, তাইরাল, রূপসা ও চাকা চিংড়ি মাছ। থাকবে দেশি মুরগি এবং গরু ও খাসির মাংস।

অব্যবস্থাপনা : পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কুয়াকাটায় প্রতিদিন দূরপাল্লার বাস আসছে ৫০-৬০টি। এ ছাড়া আসে পর্যটকবাহী শতাধিক মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার। কিন্তু কুয়াকাটায় নেই বাস টার্মিনাল। দুই-তৃতীয়াংশ হোটেলে পার্কিং সুবিধা নেই। এ কারণে দূরপাল্লার এবং অভ্যন্তরীণ রুটের বাস ও অন্যান্য যানবাহন সড়কের ওপর এবং সৈকত-সংলগ্ন জিরো পয়েন্টে পার্ক করা হয়। এতে কুয়াকাটার প্রধান সড়কে যানজট লেগেই থাকে। ফলে পর্যটকদের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হয়। সৈকতের ব্যবসায়ীরা আবর্জনা ফেলে সৈকত নোংরা করে রাখেন। কুয়াকাটায় ২০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন ২ জন। পর্যটকদের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই।

কুয়াকাটা সৈকত সংলগ্ন ঝিনুক ও বাজার ব্যবসায়ী শিমুল জনান, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই পর্যটকের আনাগোনা বাড়ে। তবে আজ পর্যটকে পরিপূর্ন কুয়াকাট সৈকত। আমাদের বিক্রি আগের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে।

সৈকত সংলগ্ন চা-বিস্কুট বিক্রেতা ইদ্রিস জানান, বড় দিনের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি। বিক্রিও করেছি অনেক ভালো। এভাবে থাকলে আমরা পিছনের লোকসান পুষিয়ে উঠতে পারবো।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক দম্পতি সিমা আক্তার ও ফারুক জানান, কুয়াকাটার প্রকৃতির সঙ্গে আমরা মিশে গেছি। বেশ আনন্দ উপভোগ করছি। তবে হোটেলের ভাড়াটা একটু বেশি মনে হয়েছে। যে হোটেলের রুম অন্য সময় ২৫শো’ টাকায় পাওয়া যায়, সেই রুম এখন ৪ হাজার টাকায় নিতে হয়েছে।
ভোলা থেকে আসা অপর পর্যটক নিলয় জানান, আমরা ১০ বন্ধু মিলে কুয়াকাটায় এসেছি। সৈকতে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে আনন্দ করেছি। বেশ ভালই লাগছে। তবে একপিছ পরাটা কিনতে হয়েছে ১৫ টাকায়। এক প্লেট ভাতের দাম ২০ টাকা। খাবারের মূল্য আমার কাছে মনে হয় অনেক বেশি রাখা হচ্ছে।

কুয়াকাটা ট্যুরিষ্ট পুলিশ জোনের সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল খালেক বলেন,বড় দিন সহ সরকারী ৩ দিনের ছুটি উপলক্ষে কুয়াকাটায় ব্যাপক পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিভিন্ন পর্যটন স্পটে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যাতে কোন পর্যটক কুয়াকাটায় বেড়াতে এসে হয়রানির শিকার না হয়। পাশাপাশি থানা পুলিশ ও নৌ-পুলিশও কাজ করছে।