দোকানের জায়গা পেল কুয়াকাটার ৩ শতাধিক ভাসমান ব্যবসায়ী

কাজী সাঈদ, কুয়াকাটা॥
দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সৈকতের ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্থায়ীভাবে ব্যবসার পরিবেশ চেয়ে আসছেন দীর্ঘ বছর যাবৎ। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে এবং সৈকত এলাকার সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে গত ১৬ এপ্রিল থেকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন) মো. রবিউল ইসলাম উপস্থিত থেকে ৩২৫ দোকানীদের অস্থায়ীভাবে বসার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অস্থায়ীভাবে বসানো হলেও পরবর্তীতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের সেখানে স্থানান্তর করা হবে এমনটাই জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, গত বছরের ১২ নভেম্বর সৈকতের জিরো পয়েন্ট এলাকায় এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দোকানগুলোতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসন। মূলত সৈকত এলাকার সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে এবং ৪৮নং পোল্ডারের পাউবো বেড়িবাধ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের জন্য এ সমস্ত ভাসমান দোকানগুলো উচ্ছেদ করা হয়। তখন এখানকার ক্ষুদ্র ভাসমান ব্যবসায়ীরা স্থায়ীভাবে ব্যবসার পরিবেশ চায়। জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট জায়গায় বসানোর কথা দেয়া হয়েছিলো। অনেক দিন পর হলেও সেই কথা রাখলেন জেলা প্রশাসন। গত কয়েকদিন ধরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন) মো. রবিউল ইসলাম ও কুয়াকাটা পৌর মেয়র আনোয়ার হাওলাদার উপস্থিত থেকে ট্যুরিজম পার্কের পূর্বপাশে দোকানগুলো বসার জায়গা দিয়েছেন। নির্দিষ্ট স্থানে সারিবদ্ধভাবে ঔষধের দোকান, খাবার হোটেল, চায়ের দোকান, চটপটির দোকান, বার্মিজ আচারের দোকান, ফিশ ফ্রাইয়ের দোকানসহ অন্যান্য দোকানগুলো পুনঃবাসন করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট জায়গা পেয়ে ব্যবসায়ীরা দোকান নির্মাণের কাজ করেছেন। যার ফলে একদিকে সৈকতের সৌন্দর্য ফিরে আসবে অন্যদিকে দোকানীরা নির্ভয়ে ব্যবসা করতে পারবেন। জেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পুরানো ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ রয়েছে। পুরানো ব্যবসায়ীরা মুখশায় জায়গা দাবি করছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পুরানো ও নতুন ব্যবাসায়ী বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না। তারা লটারীর মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষায় স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

সৈকতের পুরানো ব্যবসায়ী রিপন বলেন, ‘আমি কুয়াকাটা সৈকতের পুরানো ব্যবসায়ী। অথচ আমি জায়গা পেয়েছি ভিতরে। একেবারে নতুন দোকানদার জায়গা পেয়েছে মুখশায়। পুরানো ব্যবসায়ীদের একটু বাড়তি সুযোগ সুবিধা দেয়া উচিত ছিলো। আমাদের যেখানে বসানো হয়েছে এখানে পর্যটকরা আসছেন না। আমাদের ট্যুরিজম পার্কের পূর্ব পাশে না বসিয়ে পশ্চিম পাশে বসালে বেচাকেনা ভাল হতো। ’

খাবার হোটেল অলি আহম্মেদ বলেন, আমি আগে রাস্তার পাশে খাবার হোটেলের ব্যবসা করতাম। প্রতি বছর একবার দু’বার উচ্ছেদের কবলে পরতে হতো। যার কারণে আমার ব্যবসার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এখন নির্দিষ্ট জায়গা পাচ্ছি। মনে হচ্ছে এখন থেকে নির্ভয়ে শান্তিতে ব্যবসা করতে পারবো। তবে এবারের ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটা বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসলেও আমাদের বেচাকেনা মোটেও ভাল হয়নি। সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে দূরে হওয়ায় পর্যটকরা আসছেন না।

সরেজমিনে কথা হয় চা বিক্রেতা রেজাউল করিম শাহ, চটপটি ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন, ফিশ ফ্রাই ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন-এদের সাথে। তারা সকলে জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগে খুবই খুশি হয়েছেন। তারা দোকান নির্মাণ করে দোকানে মালামাল পসরা সাজিয়েছেন। কিন্তু ক্রেতা খুবই কম।

কুয়াকাটা আভিজাত আবাসিক হোটেল গ্রেভার ইন’র জেনারেল ম্যানেজার সাজ্জাদুল ইসলাম মিতুল, ‘কুয়াকাটার বিভিন্ন সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো দোকানগুলো এক জায়গায় নেয়ার। অবশেষে সেটা হচ্ছে, এতে সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। সৈকতের প্রবেশ পথ একটি থাকার কারণে পর্যটকদের চাপের সময় সৈকতে ওঠা নামা করতে নানা সমস্যা হয়। দোকানগুলো স্থানান্তরিত হবার ফলে সমস্যার সমাধান হলো। জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবি রাখে’।

কুয়াকাটা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট এসোসিয়েশন (কুটুম) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির বলেন, জেলা প্রশাসন যে উদ্যোগ নিয়েছে তা আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। তাদের এ উদ্যোগ সফল হলে কুয়াকাটা সৈকত এলাকার সৌন্দর্য ফিরে আসবে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কুয়াকাটা সমস্ত ভাসমান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এখানে আনতে পারলে আরো ভাল হতো। যেখানে সেখানে এ সমস্ত দোকান ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে ভালো দেখায় না।

এ প্রসঙ্গে কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র আনোয়ার হাওলাদার  বলেন, ‘কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বার বার উচ্ছেদের কবলে পরে নিঃস্ব হয়ে যায়। যেখানে সেখানে দোকানগুলো থাকলে সৈকতের পরিবেশ নষ্ট হয়। আমি জেলা প্রশাসকের সাথে বার বার এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। অবশেষে দোকানগুলোকে নির্দিষ্ট জায়গা বসাতে পারছি। এতে দোকানীরা পাবে ব্যবসার সুষ্ঠ পরিবেশ, সৈকতে বাড়বে সৌন্দর্য। ’

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর হোসেন  বলেন, কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বার বার উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু পুনঃবাসন করা হয়নি। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মহোদয় স্থায়ীভাবে পুনঃবাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে সম্ভব হয়নি। তাই আপাতত অস্থায়ীভাবে সৈকতের আশেপাশে এলোমেলো বসে থাকা দোকানগুলো ট্যুরিজম পার্কের পাশে বসানো হচ্ছে। পরবর্তীতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের সেখানে স্থানান্তর করা হবে।