বছরে মাত্র ১৫৭ দিন সমুদ্রে মাছ ধরতে পারে জেলেরা

কাজী সাঈদ, কুয়াকাটা।।
বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৫৭ দিন গভীর সমুদ্রে ইলিশ মাছ শিকার করতে পারছে উপকূলের জেলেরা। বাকি ২০৮ দিন বিভিন্ন কারণে থাকতে হচ্ছে কূলে। এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সমুদ্রগামী জেলে, ঘাটের শ্রমিক, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। অবরোধে অবরুদ্ধ হয়ে পেশা ছাড়ছেন অনেক মৎস্যজীবী।

কয়েকজন জেলে ও মাঝির সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে মাছের সুষ্ঠ প্রজনন, উৎপাদন, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সমুদ্রে ৬৫ দিন এবং ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় প্রতিবছর গড়ে ৪৫দিন সমুদ্রে যেতে পারে না মাছধরা ট্রলার। সরকারি নিষেধাজ্ঞার ৮৭ দিন ও বৈরি আবহাওয়ায় ৪৫ দিন মোট ১৩২ দিন বাদে মাছ ধরার জন্য সময় পায় ৭ মাস ৭ দিন। প্রতিমাসে দুইবার সাগরে ফিশিং করতে যেতে পারে ইলিশ শিকারীরা। প্রতিবার ফিশিং শেষে ঘাটে ফিরে আহরিত মাছ বিক্রি করে বাজার সওদায় নিয়ে সমুদ্রে নামতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ দিন। সে হিসাবে একটি ট্রলার প্রতিমাসে ৭ থেকে ৮ দিন থাকে কূলে। মাছ ধরার প্রকৃত সময় ৭ মাসের মধ্যে ৫৬ দিন সময় কাটে ঘাটে। এছাড়া প্রতিটি ট্রলার তিন মাস পর পর মেরামত করতে হয়। প্রতিবার কূলে উঠিয়ে মেরামত গড়ে ৫ দিন সময় লাগে। বছরে ৪ বারে সময় যায় ২০দিন। সবমিলিয়ে বছরে ২০৮দিন সমুদ্রে যেতে পারে না মৎস্যজীবীরা। ১৫৭ দিন সাগরে যেতে পারলেও সবসময় ইলিশ না পেয়ে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কলাপাড়া উপকূলের অন্তত ৩০ জেলে।

জেলে দুলাল বলেন, সমুদ্র থেকে ফিশিং শেষে ঘাটে ফিরে এসে মাছ বিক্রি করে আবার সমুদ্রে ফিরে যেতে ৩ থেকে ৪ দিন সময় ঘাটে ব্যয় হয়। বছরের বেশিরভাগ সময় আমরা সমুদ্রে যেতে পারি না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের অন্য পেশা খুঁজতে হবে।

অপর জেলে সোবহান জানান, কুয়াকাটা উপকূলের জেলেরা সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের আরোপিত আইন মেনে মাছধরা বন্ধ রাখলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী টহল জোরদারের পাশাপাশি দুটি অবরোধ মিলিয়ে একটি করার দাবি তাদের।

এফবি সাইম ট্রলারের মাঝি রুহুল আমিন হাওলাদার জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের জারিকৃত ৬৫ ও ২২ দিন মোট ৮৭ নিষেধাজ্ঞা থাকে। এছাড়াও বৈরী আবহাওয়ার, সমুদ্র উত্তাল, অমাবস্যা পূর্ণিমা’র জো’র কারণে বছরে ৪৫ থেকে ৫০ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকে। প্রতি তিন মাস পর পর ট্রলার মেরামত করতে সময় লাগে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ দিন। প্রতি ট্রিপে ঘাটে সময় ব্যয় হয় ৩-৪দিন। সবমিলিয়ে ২১০ থেকে ২১৫ দিন সমুদ্রে মাছ ধরতে পারি না। বাকি সময় সমুদ্রে মাছ ধরতে পারি ১৫০ থেকে ১৬০ দিন।

মহিবুল নামের অপরাধ মাঝি বলেন, ৬৫ দিনের অবরোধ আমাদের জেলে পেশার জন্য হুমকি স্বরূপ। এসময় ছেলেরা অন্য পেশায় চলে যায়। অবরোধ শেষে মাঝিদের জেলে সংকটে পড়তে হয়। এভাবে চলতে থাকলে এই পেশাটি ধ্বংস হয়ে যাবে।

মৎস্য ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, বছরের বেশিরভাগ সময় জেলেরা মাছ ধরতে পারে না সে সময় আমাদের ব্যবসাও বন্ধ থাকে। আমরা ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে দেনাগ্রস্থ হয়ে পড়ছি। কিছু ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসায় চলে গেছে। আমিও অন্য ব্যবসা খুঁজতেছি।

মজিবুর রহমান নামের অন্য এক ব্যবসায়ী বলেন, এ ব্যবসায় এখন আর লাভ নেই। জেলেদের দাদন দিয়ে আটকে পড়ছি। দাদন টাকা উঠাতে পারি না, অন্য ব্যবসায়ও যেতে পারি না। বাধ্য হয়ে ব্যবসায় টিকে আছি।

কুয়াকাটা-আলীপুর মৎস্য আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ আনসার উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমাদের এখানের ট্রলার মালিক ও জেলেরা অবরোধ পালন করছে। কিন্তু আমরা খবর পাই দেশের অন্যান্য এলাকার জেলেরা সমুদ্রের মাছ ধরে। অবরোধ চলাকালীন সময়ে আমাদের সমুদ্র সীমানায় ভিনদেশী জেলেরাও মাছ ধরে। যার ফলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ অবরোধ পুরোপুরি সফল হয় না।

এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, আমাদের জেলেরা বলে থাকেন তারা ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৫৭ দিন মাছ ধরতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে শুধুমাত্র ২২ দিনই সকল প্রকার মাছ ধরা বন্ধ থাকে সব জায়গায়। আমাদের জাটকা নিধন বন্ধের যে ৮ মাস জেলেরা কিন্তু বৈধ ফাঁসের জাল দিয়ে বৈধ মাছ ধরতে পারে। ৬৫ দিনের অবরোধে শুধুমাত্র সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকে, জেলেরা কিন্তু নদী ও খালে মাছ ধরতে পারে।

বাংলাদেশ নৌ-পুলিশ বরিশাল অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোঃ কফিল উদ্দিন বলেন, আগামী ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা নিষেধ। এই নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময় কেউ যদি আইন অমান্য করে সাগরে মাছ ধরতে যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের যারা মৎস্যজীবী বা মৎস্য পেশার সাথে সম্পৃক্ত আছেন তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে এসময় কেউ সমুদ্রে যাবেন না।