মুলাদীতে ফসলের মাঠে সরিষার হলুদ ফুলে কৃষকের মুখে ফুটে উঠেছে হাসি

ভূঁইয়া কামাল মুলাদী।।
বরিশালের মুলাদী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে আবাদি ও অনাবাদি জমিতে সরিষা ক্ষেতে হলুদ ফুলের হাসি শোভা পাচ্ছে। আর সে হাসিতে কৃষকের মুখেও ফুটেছে স্বস্তির হাসি। ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে কম খরচে অধিক লাভবান হওয়ায় দিন দিন এই উপজেলার কৃষকরা সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। উপজেলার দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠে যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর হলুদ ফুলের সমারোহ। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ জুড়ে চোখ জুড়ানো মনোমুগ্ধকর এ হলুদের দৃশ্য। সবুজ গাছের মাথায় থাকা সরিষার হলুদ ফুলগুলো বাতাসে দুলছে। ফুলে ফুলে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে মৌমাছি আর প্রজাপতি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের কৃষকেরা বারি-১৪ সরিষা চাষ করেছেন। এ ফসলের তদারকি করছেন কৃষি কর্মকর্তা নিজেই। এ বছর উচ্চফলনশীল বারি-১৪ সরিষা চাষ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কার্যালয় থেকে বীজ ও সারসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করা হয়।

কৃষি অফিস সূত্রে আরো জানা যায়, গত বছর উপজেলায়  ১৫৮০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়ে ছিল। আর চলতি বছর ১৮শত হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ করা হয়েছে। চাহিদা এবং ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকরা সরিষার চাষের দিকে দিন দিন ঝুঁকছেন। অনেক জমিতে এই ফসল চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যে কৃষকদের বাড়তি প্রণোদনা দেয়া হয়েছে।

উপজেলার কৃষকরা বলেন, সরিষা চাষ করতে খরচ কম আর লাভ বেশি। অন্য ফসলের চেয়ে কম খরচ আর অধিক লাভ হওয়ায় সরিষা চাষ করছেন অনেকেই। আগামীতে চাষের আগ্রহও প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।

উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের চর-নাজিরপুর গ্রামের কৃষক মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, আমন ধান আবাদের পরে লাগিয়ে সরিষার চাষ করেছি। ফলনও হয়েছে ভালো। উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতে চাষাবাদ হচ্ছে সরিষা। তিনি আরো বলেন, তেল জাতীয় অন্যান্য ফসলের চেয়ে সরিষার বীজে তেলের পরিমাণও বেশি। নজরকাড়া সৌন্দর্য, সেই সাথে তেল হিসেবে সরিষার ব্যবহার রয়েছে। উপজেলার চরাঞ্চলের বিস্তীর্ন মাঠ জুড়ে যেন হলুদের হাসি বিরাজ করছে। সরিষা চাষ করায় বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এলাকার কৃষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। আবাদ সংকল্প দেখে মনে হয় এমন পরিশ্রমী কৃষকদের জন্যই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিপ্লবের পাশাপাশি কৃষকরা নতুন করে সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।

উপজেলার চর-নাজিরপুর গ্রামের সরিষার ক্ষেত ঘুরে দেখতে আসা সুজন বলেন, সরিষার ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে ক্ষেত। সেজন্য আমার স্মৃতি হিসেবে ছবি তুলতে এসেছি। এসে অনেক ভালো লেগেছে। উপজেলার চর নাজিরপুর গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম জানান, চলতি বছর আমি এক একর জমিতে সরিষা চাষ করেছি। আর ফলনও ভালো হয়েছে।

উপজেলার বাটামারা ইউনিয়নের কৃষক বাদল জানান, গত বছরের চেয়ে এই বছর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ করছি। কৃষক প্রায় ১০ একর জমির চাষাবাদ সম্পন্ন করেছে। আশানুরূপ ফলন পেতে উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছে। তবে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ভালো ফলন হয়েছে।

কৃষকেরা আরো বলেন, গত বছরের তুলনায় আবহাওয়া ভালো থাকায় সারা ক্ষেতে ফুল আর ফুল। সরিষার পাতা মাটিতে পড়ে জৈব সার তৈরি হয়। তাই এইসব জমিতে পরে ফসল ইরি-আমন আবাদে নন-ইউরিয়া সার কম লাগে। এতে করে আমন আবাদে খরচ অনেক কমে যায়। এছাড়া সরিষার শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন তারা।

মুলাদী উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার মোঃ বাহাউদ্দিন ও উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বশির উদ্দিন তালুকদার বলেন, রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমণ নেই, ফলনও ভালো, কৃষি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক তদারকির কারণে রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় প্রায় ১০-২৫% ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর অনুশাসনে উদ্ভুদ্ধ হয়ে মহিলা কৃষাণী মোসাঃ রাশিদা বেগম সরিষা চাষ করে সফলতা অর্জন করেছে।

মুলাদী কৃষি বিভাগ জানায়, বারি-১৪, বীনা-১৭, ১৮ ও বীনা একাধীক সরিষা আবাদ করা হচ্ছে। সারাদেশের মতো মুলাদী উপজেলায় ৬ হাজার কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।

গত অর্থ বছরে মুলাদী উপজেলায় সরিষার আবাদ হয়েছিল যেখানে ১৫৮০ হেক্টর, সেখানে চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭০০ হেক্টর কিন্তু আবাদ হয়েছে ১৮০০ হেক্টর। এই বৃদ্ধির ধারা আগামীতেও অব্যাহত রাখতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই বিভাগ। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে থেকে সরিষার আবাদ বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এই বিভাগের কর্মীরা।

মুলাদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল ইসলাম জানান, ‘সরকার তেল ফসল বৃদ্ধির প্রকল্প হিসেবে সরিষার আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনা দিয়েছে, তাই কৃষি বিভাগ থেকে সরিষা চাষে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। সরিষা আবাদের শুরুতে কিছু বৃষ্টি হয়েছিল যারফলে ফলন ভাল হবে বলে আশা করছি।’